বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি ও সারে বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সময়মতো বৈদেশিক সহায়তা না পেলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে। বাজেটের বৈদেশিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত এই বিশাল অংকের অর্থের পূর্ণ সংস্থান নিশ্চিত হয়নি। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি ডলারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে ভর্তুকি বাবদ ব্যয়ের চাপও ক্রমাগত বাড়ছে। অর্থবছরের শেষ চার মাসে বাজেট সহায়তার জন্য সরকারের আরও ৩২০ কোটি ডলার প্রয়োজন।
উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনা চললেও অর্থপ্রাপ্তির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান না হলে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী বর্তমানে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার। এক বছর আগে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের বকেয়া দায় মেটানোর পর রিজার্ভ দুই হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও কয়েক মাস বজায় থাকবে। এর ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হবে। এই বাড়তি খরচ রিজার্ভ থেকে মেটানো সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তবে সরকার এখনই জ্বালানির দাম বাড়ানোর বা ভর্তুকি কমানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে ভর্তুকি সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। তিনি এই সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আর্থিক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারের বিভিন্ন শর্ত নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০০ কোটি ডলার পাওয়ার বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছেন। তবে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত কর্মকর্তাদের মতে, ঋণের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে। আইএমএফের সহায়তা সময়মতো না পেলে অন্য সংস্থাগুলোর ঋণ পেতেও দেরি হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো এখন বহুমুখী হয়ে উঠেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ মন্দার পাশাপাশি রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। তিনি মনে করেন, বৈদেশিক অর্থায়ন পেতে হলে আর্থিক খাতে সংস্কার এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার পাশাপাশি সরকারের কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৫১ কোটি ডলার। এর মধ্যে সরকারের ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে ঋণের মূল ও সুদ মিলিয়ে মোট ৪৭৪ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে জ্বালানি ও সারে বাড়তি ২৬১ কোটি ডলার ভর্তুকি লাগতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বাজেট সহায়তা ঋণ থেকে ঋণের বড় অংশ পরিশোধের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে সেখানে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের ঘাটতি রয়ে গেছে। বাড়তি ভর্তুকি খরচ মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে মোট ৩২০ কোটি ডলারের জরুরি অর্থায়ন প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) এই অর্থের সংস্থান করতে ১২ এপ্রিল চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।
ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশ ২০০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়েছে। বিশ্বব্যাংক এই বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও আইএমএফ এখনো কোনো চূড়ান্ত জবাব দেয়নি। ইআরডি অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে। কিন্তু অনেক দাতাসংস্থার ঋণ আইএমএফের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের সঙ্গে ৫৫০ কোটি ডলার ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি নিয়ে আলোচনা করেছে। গত বুধবারের সেই বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
সরকারি কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক ও রাজস্ব সংস্কার নিয়ে বাংলাদেশকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে আরও তিনটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ২৩ এপ্রিল আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসবে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করবে এবং তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জুন মাসে ঋণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
সব কিছু ঠিক থাকলে জুলাই মাসে বাংলাদেশ ১৩৭ কোটি ডলারের কিস্তি পেতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য বাজেট সহায়তা জুনের মধ্যে ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী জুন মাসে শেষ হবে চলতি অর্থবছর। মাসরুর রিয়াজ জানান, বাংলাদেশ ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, এডিবি এবং বিশ্বব্যাংক থেকেও ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। জাহিদ হোসেনের মতে, আইএমএফের কর্মসূচিতে অগ্রগতি হলে বিশ্বব্যাংকের পাইপলাইনে থাকা ৮০০ কোটি ডলার এবং জাইকার সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ হবে। আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ৫০০ কোটি ডলার এবং বিশ্বব্যাংক ২৫০ কোটি ডলারের জরুরি তহবিল ঘোষণা করেছে।
ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার দ্রুত বৈদেশিক অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ এডিবি থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈদেশিক চাপ থাকলেও দেশের ভেতরে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় কম হওয়ায় সরকার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। গত ১৬ বছরের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বরাদ্দের মাত্র ২১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। ব্যয় কম হওয়ায় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ আগের চেয়ে কমেছে।
সরকার ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ৮২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশ। গত অর্থবছরে সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ নিয়েছিল। তবে রাজস্ব আদায় কম হলে মে ও জুন মাসে ঋণের পরিমাণ বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিশেষ নিলাম এবং সুকুক বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে।


