উত্তরাঞ্চলীয় ১৬টি জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি’র (নেসকো) ‘সিস্টেম লস’ বা বিদ্যুৎ অপচয়ে রাজশাহীর চেয়ে এগিয়ে আছে রংপুর জোন। রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ হলেও রংপুর বিভাগের আট জেলায় এই হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশে।
সিস্টেম লসের এই ব্যবধান কোনো এক বছরের সাময়িক ঘটনা নয়। গত সাত বছর ধরে রংপুরের এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ অপচয়ের কারণে সরকারের ২৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বেশি লোকসান হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ অপচয়ের দিক থেকে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রংপুর।
কারিগরি ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনাকে মূলত বিদ্যুৎ অপচয়ের কারণ বলা হলেও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও ত্রুটিপূর্ণ মিটারের কারণে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অবৈধ সংযোগের বিপরীতে সরকার কোনো বিল আদায় করতে পারে না বলে এই অপরাধমূলক অপচয় কারিগরি সীমাবদ্ধতাকেও বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে প্রতি বছর দেশের ক্ষতি হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
রংপুর অঞ্চলের বিদ্যুৎ অপচয়ের পরিস্থিতি বর্তমানে দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজধানীর একাংশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি বা ডেসকোর বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। অন্যদিকে, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বা ডিপিডিসির অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
একই সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির অপচয়ের হার রেকর্ড করা হয় ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অপচয়ের হার ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অপচয়ের হার ৮ দশমিক ৫১ শতাংশে পৌঁছায়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশ শাখার প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ অপচয়ের মধ্যে সঞ্চালন ও বিতরণ উভয় লাইনের অপচয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে।
বিশ্বজুড়ে কারিগরি কারণে গ্রিডের বিদ্যুৎ অপচয়ের গড় হার প্রায় ৮ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে এটি সাধারণত ৬ শতাংশের নিচে থাকে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ অপচয় কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উন্নতির অনেক সুযোগ রয়েছে।
অবশ্য ২০০১-০২ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। সে সময় বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সম্মিলিত অপচয় ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ২৮ শতাংশ। বর্তমানে গড় বিদ্যুৎ অপচয় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এর সঙ্গে ৩ শতাংশ সঞ্চালন লাইনের অপচয় যোগ করলে মোট অপচয়ের পরিমাণ ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা এখনও বৈশ্বিক গড় হারের চেয়ে দুই শতাংশ বেশি।
বিদ্যুৎ অপচয়ের পেছনের তিন কারণ
রংপুর অঞ্চলে কেন এত বেশি বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে জানতে চাইলে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান তিনটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন।
প্রথমত তিনি উত্তরবঙ্গে কার্যকর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তীব্র সংকটের কথা জানান। তিনি বলেন, সিরাজগঞ্জ এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সেগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। একইভাবে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় একটি ৫২৫ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও সেখান থেকে এখন ৫০ থেকে ৬০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ মিলছে না।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে আরেকটি ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। কারণ, সেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ২৫ থেকে ৩০ টাকার মতো। এর ফলে ঢাকা থেকে ৫৫০ কিলোমিটার দূর দিয়ে বিদ্যুৎ নিয়ে যেতে হয়, যা বিশাল সঞ্চালন অপচয় সৃষ্টি করে।
নেসকো প্রধান রংপুর অঞ্চলের ২৮ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুৎ গ্রিডের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, বিশেষ করে লালমনিরহাটের সঞ্চালন লাইনের অবস্থা খুবই নাজুক।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব নেসকোর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। অথচ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের এ দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল।
মশিউর রহমান বলেন, এখানকার লাইনগুলো যেমন জরাজীর্ণ, তেমনি সাবস্টেশনগুলোর অবস্থাও খারাপ। এই দুর্বল লাইনের কারণে সম্প্রতি রংপুরে ভোল্টেজ ৩৩ কিলোভোল্ট থেকে কমে ২৬ কিলোভোল্টে নেমে এসেছে। লালমনিরহাটে এটি আরও কমে ২৪ বা ২৫ কিলোভোল্ট হয়ে গেছে। ভোল্টেজ কমে গেলে বিদ্যুতের প্রবাহ বা কারেন্ট বেড়ে যায়, যা অপচয়ের পরিমাণকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সর্বশেষ কারণ হিসেবে তিনি দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রায় সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাজশাহীতে বসবাস করেন। একজন প্রধান প্রকৌশলী ছাড়া শীর্ষ কর্মকর্তারা রংপুর অঞ্চলে যেতে বা সেখানে থাকতে চান না। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে মাঠ পর্যায়ের নজরদারি ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
প্রধান কার্যালয়ই যেখানে সমস্যা
এই অঞ্চলের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক উত্তরবঙ্গে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন।
তিনি জানান, সিরাজগঞ্জে ৬৮ মেগাওয়াট এবং লালমনিরহাটে ৩০ মেগাওয়াটের দুটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবধান দূর করতে নেসকোর প্রধান কার্যালয় রাজশাহী থেকে বগুড়ায় স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তার মতে, রাজশাহী থেকে রংপুরের অতিরিক্ত দূরত্বের কারণে মাঠ পর্যায়ে সঠিক তদারকি করা যাচ্ছে না।
এই কার্যালয় স্থানান্তর প্রক্রিয়াও দীর্ঘদিনের একটি ঝুলে থাকা প্রতিশ্রুতি। ২০১৬ সালে যখন নেসকো যাত্রা শুরু করে, তখন কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে রাজশাহী ও রংপুরের মাঝামাঝি সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বগুড়ায় প্রধান কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সাময়িকভাবে রাজশাহী থেকে কার্যক্রম শুরু করার সেই সিদ্ধান্ত এক দশকের স্থবিরতায় রূপ নেয়।
চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যালয় স্থানান্তরের অনুরোধ জানালে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। এরপর ৩ মার্চের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ সানাউল হককে আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আইপিপি সেল-১ এর পরিচালক মো. গোলাম মোর্তুজাকে সদস্য করে একটি সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠন করা হয়।
এক মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার দায়িত্ব পেয়ে কমিটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, রাজশাহীর তুলনায় রংপুর অঞ্চলের বাণিজ্যিক কার্যক্রম খুবই দুর্বল। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুর জোনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বিশেষ করে নেট লোকসান কমানো এবং বকেয়া বিল আদায়ের বিষয়ে আরও নিবিড় নজরদারি দরকার।
গত ৩ এপ্রিল কমিটি বগুড়া সদর উপজেলায় পুরোনো বগুড়া বিদ্যুৎ ভবনের পাশে ৫১ দশমিক ৫৯ একরের একটি সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে। সেখানে সাড়ে সাত একর জমিতে একটি বিদ্যুৎ গ্রিড রয়েছে।
এ ছাড়া সেখানে তিন তলা বিশিষ্ট ৭ হাজার ২ বর্গফুটের একটি কার্যকর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় এবং একটি পুরোনো তিন তলা ভবন রয়েছে যা সংস্কার করা সম্ভব। এই জমিতে দুটি দোতলা রেস্ট হাউস এবং দুটি আবাসিক ভবনও রয়েছে। এই অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কর্পোরেট কার্যালয় চালুর জন্য আপাতত যথেষ্ট এবং ভবিষ্যতে স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য সেখানে প্রচুর খালি জমিও রয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকেও এই স্থানান্তর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করবে। বর্তমানে রংপুর থেকে রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে যেতে ২১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কার্যালয়টি বগুড়ায় নিয়ে আসলে সেই দূরত্ব অর্ধেকেরও বেশি কমে যাবে এবং রংপুরের দূরত্ব হবে মাত্র ১০৫ কিলোমিটার।
অন্যদিকে, বগুড়া থেকে রাজশাহীর দূরত্ব প্রায় ১১৩ কিলোমিটার হওয়ায় এটি দুই অঞ্চলের জন্যই একটি চমৎকার কেন্দ্রীয় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
তা ছাড়া বগুড়া থেকে রাজধানীর দূরত্বও অনেক কম। রাজশাহী থেকে ঢাকার দূরত্ব ২৫২ কিলোমিটার হলেও বগুড়া থেকে এর দূরত্ব ১৯৩ কিলোমিটার। কমিটি মনে করে, মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পিডিবির সঙ্গে দাপ্তরিক যোগাযোগের জন্য বগুড়ার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত।
কমিটির বিশ্লেষণে বলা হয়, দুর্বল তদারকি, তীব্র জনবল সংকট এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে রংপুর অঞ্চল রাজশাহীর চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে যান না বললেই চলে। অন্যদিকে, রংপুরের কর্মীদের সাধারণ কাগজপত্রের কাজের জন্য রাজশাহীতে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রচুর সময়, শ্রম ও ভ্রমণ ভাতা নষ্ট হয়।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মাঝামাঝি জায়গায় নেসকোর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হলে উভয় অঞ্চলে সমানভাবে নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ অপচয় কমবে এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কমিটির সদস্য মো. গোলাম মোর্তুজা বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছি এবং সেখানে বিস্তারিত সবকিছু উল্লেখ করেছি। প্রতিবেদনটি এখন মন্ত্রণালয়ে থাকায় এই মুহূর্তে আমার আর কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
তবে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই পরিবর্তনের বিষয়ে বেশ আশাবাদী। তিনি বলেন, বগুড়ায় কার্যালয় স্থানান্তর তাদেরকে কাজের ক্ষেত্রের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। এটি ঢাকার দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার কমিয়ে দেবে, যা সরাসরি পরিচালন ব্যয় কমাবে।
রাজশাহী থেকে কার্যালয় সরিয়ে নিলে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি তা নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, মোটেও কোনো সমস্যা হবে না। প্রধান প্রকৌশলী, পরিকল্পনা বিভাগ এবং ডেটা সেন্টার সবই রাজশাহীতে থাকবে। কেবল করপোরেট কার্যালয়টি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, যেখানে মূলত এমডি এবং নির্বাহী কর্মকর্তারা বসবেন।


