ভয়-শঙ্কা আর নানা চড়াই-উতরাই পার হয়ে আবারও তার হারানো রঙ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। উগ্র ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বিরোধিতা আর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে বর্ষবরণের যে উৎসব ম্লান হয়ে গিয়েছিল, তা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে নতুন বিএনপি সরকার।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বৈশাখের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীবাসী এক অনন্য উৎসবে মেতে উঠত। রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন থেকে শুরু করে গুলশানের বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ পার্কের বৈশাখী মেলা পর্যন্ত সবখানেই ছিল সাংস্কৃতিক জোয়ার। সেই সময় মানুষ নতুন আলোয় সাজানো প্রকৃতির বন্দনা, দেশপ্রেম ও আত্মজাগরণের সুরে ভেসে বেড়াত।
সেবার মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজিত হয়েছিল কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে নেওয়া ‘আমরা তো তিমির বিনাশী’ প্রতিপাদ্যে। সম্প্রীতির গানে মানুষ সেই শোভাযাত্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছিল। শোভাযাত্রায় প্রদর্শিত হয়েছিল নানা রঙের মুখোশ ও প্রতিকৃতি।
আগে প্রতিবছর বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত হতো সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের অনুষ্ঠান। এছাড়া শাহবাগে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও রমনায় ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী নানা কর্মসূচি পালন করত। শেরেবাংলা নগরে সুরের ধারা ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার পরিচালনায় এক হাজার শিল্পীর সেই সম্মিলিত গান ছিল সংস্কৃতির এক মহাসমাবেশ।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দলের আপত্তিতে উৎসবের সেই চেনা উচ্ছ্বাস অনেকটা স্তিমিত হয়ে যায়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস থাকলেও জনমনে ছিল শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় শোভাযাত্রার প্রস্তুতিকালে আগুনের ঘটনায় সেই শঙ্কা ফুটে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’ প্রতিপাদ্যে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হলেও তার নাম পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। আবু সাঈদের প্রতিকৃতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভিন্নমুখী অবস্থানের কারণে আয়োজনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
সেই শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। তবে শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, সবার সঙ্গে আলোচনা না করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাধ্যমে এই আয়োজন করা হয়েছিল।
উৎসবের এই সময়ে ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা এবং শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন নিয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পহেলা বৈশাখ তখন সাংস্কৃতিক উৎসবের চেয়ে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়।
চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী চিন্ময় ঘোষ জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়নি। মানুষের মনে তখন এক ধরনের ভয় কাজ করত।
শিক্ষার্থী মুনতাহা রহমান মনামী জানান, গত বছর পরিবেশ বেশ নিস্তেজ ছিল। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
সেই বছরের ডিসেম্বরে সংঘবদ্ধ মব সন্ত্রাসে ছায়ানট ও উদীচীর মতো সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলার পর সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর এমন আঘাত আবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে বাঙালির এই উৎসব থমকে থাকেনি। ২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকারের অধীনে দৃশ্যপট আবার বদলে যায়। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’। সরকার এই উৎসবকে সার্বজনীন ও সুশৃঙ্খল করার ঘোষণা দিয়েছে।
চারুকলার ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা আবারও নতুন উদ্যমে আয়োজিত হচ্ছে। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছায়ানটও হামলার ক্ষত কাটিয়ে ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য’ প্রতিপাদ্যে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের এই অনুষ্ঠান বিটিভির মাধ্যমে সব টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে।
এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেই দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বর্ষবরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা এবারের আয়োজনকে একটি উত্তরণ হিসেবে দেখছেন। চিন্ময় ঘোষ মনে করেন, দেশে এখন একটি নির্বাচিত অভিভাবক সরকার থাকায় ভয়ের অনুভূতি নেই। মুনতাহা রহমান মনামী জানান, এ বছর পহেলা বৈশাখ আবার তার আগের রূপে ফিরে এসেছে। এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি স্থিতিশীল, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলেমিশে কাজ করছেন।
তবে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রার নাম নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি। প্রথমে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হয়ে পরে এর নাম হয়েছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এর নাম আবারও ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। বর্তমান সরকার এবার এর নাম দিয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নাম পরিবর্তনের এই ধারা স্রেফ রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়।
তবে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ মনে করেন, নাম পরিবর্তনে মূল চেতনা বদলায় না। তার মতে, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাই আসল কথা।
এরপরও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থী পূর্ণতা সন্ধি। তবে এবারের আয়োজনে বাঙালি যে তার সংস্কৃতি ভুলে যায়নি, তা দেখে তিনি সন্তুষ্ট।
সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা ও রাজনৈতিক সংকীর্ণতার এই সংগ্রাম আজও চলছে। কেউ ধর্ম, কেউ ঐক্য, আবার কেউ বাঙালির শিল্পের মাঝে এই উৎসবকে খুঁজে ফিরছেন।


