ঐতিহ্যবাহী ফসলের পাশাপাশি পুষ্টিকর ও উচ্চমূল্যের সবজি চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে রাজবাড়ীতে। জেলার সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের শাইলকাঠি গ্রামে এবার বিটরুট চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন কৃষকরা। বিশেষ করে কৃষক লিয়াকত সরদারের বাম্পার ফলন ও অভাবনীয় মুনাফা দেখে এলাকার অন্য চাষিদের মধ্যেও বিটরুট চাষে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
শাইলকাঠি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন বিটরুটের আবাদ। কৃষক লিয়াকত সরদার এ বছর ৪০ শতাংশ জমিতে এই সবজির চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি শতাংশ জমিতে গড়ে চার মণ করে বিটরুট ফলন হয়েছে। ফলন যেমন ভালো হয়েছে, তেমনি বাজারদর নিয়েও তিনি সন্তুষ্ট।
লিয়াকত সরদারের এই সাফল্য দেখে শাইলকাঠি গ্রামের আরও অনেক কৃষক বিটরুট চাষ শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে কৃষক সুজাত মোল্লা ৪ শতাংশ এবং বাচ্চু মোল্লা ৫ শতাংশ জমিতে বিটরুট চাষ করেছেন। অল্প জমি হলেও উভয়েই আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
কৃষক লিয়াকত সরদার বলেন, ‘আমি এ বছর জানুয়ারি মাসে বিটরুটের বীজ রোপণ করেছিলাম। সঠিক পরিচর্যার পর এপ্রিল মাস থেকে আমি পুরোদমে ফসল সংগ্রহ শুরু করেছি। অল্প সময়ে এমন ফলন ও লাভ হবে তা ভাবিনি। শুরুর দিকে দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছি, এখন দাম কিছুটা কমলেও (১২০০ টাকা) বিটরুট চাষে অন্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভ থাকছে।’
কৃষক সুজাত মোল্লা বলেন, ‘লিয়াকত ভাইয়ের সফলতা দেখে ছোট পরিসরে চাষ শুরু করি। অল্প জমিতেই ভালো ফলন ও লাভ হয়েছে। বাড়ির খরচ চালাতে এটি অনেক সহায়তা করেছে। আগামীতে আরও বেশি জমিতে চাষের পরিকল্পনা আছে।’
অন্যদিকে কৃষক বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘বিটরুট আমাদের জন্য নতুন আশার আলো। অল্প সময়ে ও কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এটি এখন অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।’
স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজবাড়ীর উৎপাদিত বিটরুট এখন ফরিদপুর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, পাবনা এবং রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে এই সবজির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ী জেলায় শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বিটরুটের মতো উচ্চমূল্যের সবজি আবাদ হচ্ছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, শাইলকাঠি গ্রামের মাটি ও আবহাওয়া বিটরুট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, সেচ ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে পরামর্শ দেওয়ার ফলে তারা দ্রুত সফলতা পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের স্বল্পমেয়াদি এই ফসল কৃষকদের দ্রুত আর্থিক সচ্ছলতা এনে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় এনে এই সফলতা পুরো ইউনিয়নে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. জনি খান বলেন, ‘জেলার মাটি ও জলবায়ু বিটরুট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি প্রথাগত ফসলের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভজনক। কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও কারিগরি সহায়তার কারণেই কৃষকরা বাম্পার ফলন পাচ্ছেন। বিটরুট চাষকে জেলাজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
তিনি জানান, রাজবাড়ীর উৎপাদিত বিটরুট এখন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজবাড়ীর শাইলকাঠি গ্রামের এই বিটরুট চাষ জেলার কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ধান বা পাটের মতো প্রথাগত ফসলের বাইরে এসে উচ্চমূল্যের এই বিদেশি সবজি চাষ করে লিয়াকত সরদার, সুজাত মোল্লা ও বাচ্চু মোল্লারা যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন, তা জেলার হাজারো কৃষকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিটরুটের ক্রমবর্ধমান বাজারচাহিদা এবং কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকি বজায় থাকলে রাজবাড়ী জেলা খুব শিগগির দেশের অন্যতম বিটরুট উৎপাদনকারী অঞ্চল পরিণত হবে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে এই বিটরুটই হতে পারে এই অঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য বদলানোর প্রধান হাতিয়ার।


