এক সময়ের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ‘গণভবন’ বদলে যাচ্ছে। জনরোষের মুখে কার্যত ধসে পড়া এ ভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপ দিতে কাজ চলছে পুরোদমে। এখানেই জীবন্ত হয়ে উঠবে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, বিজয়-বিষাদের স্মৃতি।
অন্তর্বতী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আগামী ৫ আগস্ট উদ্বোধন হতে পারে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের উত্তর কোণে অবস্থিত গণভবন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানেই বসবাস করতেন। অন্য সময়ে সরকার প্রধানরা বসবাস করতেন অন্যত্র। তবে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এখানে বসবাস শুরু করেন। মাঝে সরকারে না থাকায় তিনি গণভবন ছাড়েন। ফের ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করে ফের পরিবারসহ গণভবনে ওঠেন শেখ হাসিনা। সেই থেকে গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার আগ পর্যন্ত সেটিই ছিল তার ঠিকানা। দীর্ঘসময় ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এ গণভবন ধীরে ধীরে পৌঁছে যায় জনরোষের কেন্দ্রে। তাই সরকার পতনের বিজয় উৎসব করেছে জনতা এ ভবন ঘিরেই।
শেখ হাসিনার পতনের পর এক মাসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়, গণভবনকে রূপান্তর করা হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘরে। নানা প্রক্রিয়াশেষে এক বছর পরে তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের জন্য বড় টিম করা হয়েছে। টিমের সদস্যরা বিভিন্ন কাজ করবে, এজন্য কমিটি হয়েছে, অনেকগুলো সাব কমিটি হয়েছে। আশা করি, আগামী দেড় মাসের মধ্যে কাজগুলো শেষ করে ৫ আগস্টের মধ্যে জাদুঘর ওপেন করতে পারব।’
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের আগেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের অনেক কাজ এগিয়ে নেয় সরকার। ইতোমধ্যে সেখানে বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। ৫ আগস্টকে সামনে রেখে কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। যে স্থাপনা ভাঙা অবস্থায় রয়েছে, সেটিকে সেই অবস্থায় রেখে জাদুঘর করার কাজ চলছে।
গতবছর মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে জাদুঘরের কাজ শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে জাদুঘরের গঠন, সংগ্রহ, এবং প্রদর্শনী সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা করা হয়। বিভিন্ন দেশে বিপ্লব ও বিদ্রোহের স্মরণে বিভিন্ন স্মৃতিস্মারক কিভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, তা জানতে যোগাযোগ করা হয়েছে। অভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘর করায় যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. জাহিদুল হক সবুজ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠবে। জুলাই বিপ্লবের বীরত্ব এবং শোকগাথা তুলে ধরা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে। এই জাদুঘরটি শুধু একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়, ইতিহাস ও গবেষণার একটি ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হবে।’
‘আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধসহ অনেক কিছু আছে। কিন্তু ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নেই। আমরা জুলাই আন্দোলনের কোনো কিছু হারাতে চাই না। জুলাই শুধু বীরত্বের নয়, একই সঙ্গে বেদনারও গল্প।’

গত বছরের ২৮ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গণভবন পরিদর্শন করে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি হিসেবে দ্রুত সেখানে জাদুঘর নির্মাণ করতে বলেন।
২৪ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন ‘গণভবনকে’ জাদুঘরে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পায়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণভবনে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করবে।

এরপর গত ২ নভেম্বর লেখক ও গবেষক এবাদুর রহমানকে আহ্বায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলমকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের’ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
সেদিন তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই জাদুঘরে আন্দোলনের পুরো সময়ের স্মৃতির দিনলিপি থাকবে। যারা নিহত হয়েছেন, তাদের তালিকা থাকবে, স্মৃতি থাকবে। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যে নিপীড়নের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, সেগুলো জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি ছাত্র-জনতার বিজয়ের স্মৃতিচিহ্নও সংরক্ষণ করা হবে। স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবেও এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
গতবছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে গেলে লাখো জনতা সেখানে হামলা চালায়। বিক্ষোভকারীরা গণভবনের দেয়াল ও কক্ষে শেখ হাসিনার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে গ্রাফিতি এঁকে দেয়।


