বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কি পদ হারাবেন রাষ্ট্রপতি?

বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কি পদ হারাবেন রাষ্ট্রপতি?
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

এক সংবেদনশীল পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার পর বিএনপি চলতি সপ্তাহেই নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ কিংবা সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই একটি বিতর্ক রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন কি তার পদে বহাল থাকবেন?

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে তার মেয়াদ আছে আরও প্রায় দুই বছর।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যদি এই পদে পরিবর্তন আনতে চায়, তবে তাদের সামনে প্রধানত দুটি পথ খোলা রয়েছে।

প্রথম পথটি হলো রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছায় পদত্যাগ। রাষ্ট্রপতি যদি নিজ উদ্যোগে পদ ছাড়েন অথবা নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষিতে সরে যেতে রাজি হন, তবে সংসদ নতুন উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট। এর জন্য নবগঠিত সংসদে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে। তাত্ত্বিকভাবে, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন থাকায় বিএনপির পক্ষে এই প্রক্রিয়ায় সফল হওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সদস্য সংখ্যা রয়েছে।

আইনবিদদের মতে, অভিশংসন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও এটি রাজনৈতিকভাবে বেশ স্পর্শকাতর। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির পদটি যেহেতু মূলত অলঙ্কারিক, তাই অভিশংসনকে অনেক সময় চরম বা শেষ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আরও পড়ুন

নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির নিজের পরিকল্পনা কী, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি নতুন সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সরে যাওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়, তবে বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারেন।

এ বিষয়ে ‘টাইমস অফ বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিষয়টিকে সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে, বিএনপির ভেতরেও এই ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। দলের এক পক্ষের মতে, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক রীতি মেনে রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং এরপর তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। এতে নতুন সংসদ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ পাবে।

দলের অন্য একটি অংশ মনে করে, শপথ গ্রহণের পর বিএনপি সংসদীয় দলের বৈঠক ডেকে সেখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতিকে তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে দেওয়া হবে কি না সেটি বিএনপির সংসদ সদস্যরাই ঠিক করবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অভিশংসনের পথে না হেঁটে রাষ্ট্রপতিকে আলোচনার মাধ্যমে পদত্যাগ করানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তারা মনে করেন, অভিশংসন প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে বিভাজন তৈরি করতে পারে, যা উভয় পক্ষের জন্যই বিব্রতকর হতে পারে।

বিএনপির অভ্যন্তরে কেউ কেউ মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত একজন রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখা দলের বিশাল ম্যান্ডেট এবং সংসদীয় জয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে দলের মধ্যপন্থী অংশটি সতর্ক করে বলছে, মেয়াদের সামান্য সময় বাকি থাকতে একজন রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলে তা নতুন সরকারের ‘নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ গড়ার অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি নিজে থেকে সরে যাওয়ার সংকেত না দিলে জোরপূর্বক অভিশংসন করা হলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও তাকে শপথ পাঠ করানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন রাষ্ট্রপতি।

বিএনপি এই জটিল পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, তা তাদের আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনা কৌশলের একটি বড় পরীক্ষা হবে। তারা কি ক্ষমতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেবে নাকি প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতাকে প্রাধান্য দেবে, তা এখন দেখার বিষয়। খুব শিগগির নতুন সংসদের অধিবেশন বসতে যাচ্ছে, আর সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের থাকা না থাকার বিষয়টিই সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনের সুর ঠিক করে দেবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad