মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে ফের সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র সংগঠন আরএসও এবং আরসা। ফলে বাংলাদেশের বান্দরবান সংলগ্ন সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতি আবারও সংঘাতময় হয়ে উঠছে।
গত মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এ পর্যন্ত দুই দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন সীমান্তের এপারে বসবাসরত ম্রো বাসিন্দারা।
যেহেতু ওপারে সংঘাত হলে এপারে বসে তা টের পাওয়া যায়, অনেক সময় গুলি বা মর্টার শেলও উড়ে আসে; তাই স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও উদ্বেগ ছড়ায়। যদিও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পক্ষ থেকে বারবারই বলা হয়েছে, আতঙ্কের কিছু নেই। তবু পুরোপুরি নিরুদ্বেগ থাকতে পারছেন না সীমান্তের বাসিন্দারা।
আলীকদমের কুরিকপাতা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো জানিয়েছেন, মিয়ানমারে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে তারা সংঘর্ষের খবর পাচ্ছেন। তবে কী নিয়ে সশস্ত্র বিবাদে জড়াচ্ছে দলগুলো তা তাদের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়।
কয়েকটি সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক পিলার নং ৩৪-৩৫-৩৬ থেকে শুরু করে পিলার ৫৫-৫৬-৫৭ এলাকা পর্যন্ত চলছে দুই ধর্ম ও দুই জাতিস্বত্ত্বার মানুষের মধ্যে এই যুদ্ধ।
মানচিত্রের হিসেবে, সহিংস এলাকাটি বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা এলাকার ওপারে অবস্থিত। জনবিরল এই এলাকার এপার ওপার দু’পারেই ম্রো জনগোষ্ঠির বসবাস।
কেন ওপারে এই যুদ্ধ তা জানতে বেশ কয়েকটি পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে টাইমস অব বাংলাদেশ। তারা বলছেন, পাচারের জন্য অনেকটা নিরাপদ রুট হওয়ায় ৫৫ থেকে ৫৮ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলার এলাকায় সব সশস্ত্র গ্রুপেরই স্বার্থ নিহিত। বহু আগে থেকেই এই বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। আর এই স্বার্থের কারণেই এসব এলাকা দিয়ে গরু বা মাদক পাচার কখনো বন্ধ হয় না। মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হলেও তা নিয়মিত হয় না।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আলীকদমের ওপারে গোলাগুলিকে স্বার্থের দ্বন্দ্বের চেয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন সীমান্তের খবর রাখে এমন সূত্রগুলো।
নিরাপত্তা বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাখাইন দখলে নেওয়ার পর রোহিঙ্গাসহ অন্যদেরও অধিকার নিশ্চিত করা হবে-এমন অঙ্গিকার ভঙ্গের প্রতিবাদ হিসেবে এই হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা হতে পারে।’
‘আরাকান আর্মির জনবলের তুলনায় আরএসও এবং আরসা অনেক দুর্বল হওয়া স্বত্ত্বেও প্রতিশোধ হিসেবে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির দখল করা কিছু ক্যাম্প দখলে নিতে পেরেছে আরএসও। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা এসব ক্যাম্প থেকে মাঝে মধ্যেই গুলি করছে আরএসও।’
হঠাৎ করে যুদ্ধ পরিস্থিতি নাইক্ষ্যংছড়ি সংলগ্ন এলাকা থেকে আলীকদমের ওপারে স্থানান্তরিত হলো কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রসদ সাপ্লাই চেইন কেটে দেওয়াই মূল লক্ষ্য হতে পারে। আগের সাপ্লাই রুটের ভৌগোলিক অবস্থান ধীরে ধীরে উত্তর দিকে (আলীকদম) সরে গেছে। উত্তেজনা স্থানান্তরিত হবার অন্যতম কারণ সেটিও।’
আরাকান আর্মির রসদ সামগ্রী টাকার বিনিময়ে এক সময় আরএসও পৌঁছে দিত বলে জানান তিনি। এখন তার ধারণা, সম্ভবত সেই কাজ এখন চলে গেছে এপার-ওপারের স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে। এতে আরএসওর আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা আরাকান আর্মির রসদ সাপ্লাই চেইন কেটে দিয়ে আরাকান আর্মিকে দুর্বল করতে চাইছে। এ কারণে আতঙ্ক ছড়াতে ফায়ারিং পরিস্থিতি তৈরি করা হতে পারে।’
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, থানচি এবং রুমার কাছাকাছি রাঙ্গামাটির ধুপ পানি ছড়া পর্যন্ত মিয়ানমারের ভৌগোলিক সীমারেখা বিস্তৃত।
বান্দরবান, রুমা ও আলীকদমে বিজিবির সেক্টর প্রশাসন রয়েছে। থানচির বলিপাড়া এবং নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবির স্বতন্ত্র ব্যাটেলিয়ন রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু বর্তমানে বিশাল এই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ হয় কক্সবাজার থেকে।
রামু বিজিবির ৩০ নম্বর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মাহতাব উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ওপারের ঘটনাগুলো মিয়ানমারের আভ্যন্তরীন বিষয়। তবুও বাংলাদেশ ভূখণ্ড সংলগ্ন হওয়ায় বিষয়টি গভীর সতর্কতার সঙ্গে মনিটর করা হচ্ছে। বাহিনীর সদস্যরাও সজাগ রয়েছেন।’
ফলে এসব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
যদিও সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, ১৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনকে আরও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এতে স্থানীয়রা আরও নিরাপদ বোধ করবেন, অপরাধও কমে আসবে।


