আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মধ্যে সবসময়ই বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা নিয়মিত ঢাকার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ড্রয়িংরুমে বসে নানা রাজনৈতিক দফারফা করতেন।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ২০১৮ সালে তার বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে এই প্রথার কথা সরাসরি স্বীকার করেছিলেন। একে একটি ‘ভুল প্রথা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ আসলে কারা শাসন করবে–তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য ও সূক্ষ্ম ক্ষমতার লড়াই রয়েছে। এই প্রবণতা এখনো চলছে বলে মনে হয়। অনেক বাংলাদেশিই বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয় দেশই আসলে নিজেদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়েছে।
ভারত সম্প্রতি তাদের অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা এখন বিএনপির প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া ২৮ জানুয়ারি ভারতের রাজ্যসভায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে একটি শোক প্রস্তাবও আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতেও গত কয়েক বছরে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হচ্ছে। গত ২২ জানুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর এই আলোচনা আরও গতি পায়। সেখানে একজন মার্কিন কূটনীতিককে উদ্ধৃত করে বলা হয়, বাংলাদেশ আরও বেশি ইসলামপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত আগের চেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করবে। ওই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘আমরা তাদের বন্ধু হিসেবে পেতে চাই।’ জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারাও বিভিন্ন জনসভায় বলছেন, তারা আগামীতে সরকার গঠনের জন্য ওয়াশিংটনের সমর্থন পাচ্ছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দিল্লি ও ওয়াশিংটনের জাতীয় স্বার্থ আলাদা হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তবে একটি জায়গায় দুই দেশ একমত—তা হলো চীনের প্রভাব ঠেকানো। এই একটি বিষয়ই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতি দুই দেশের আচরণ ঠিক করে দেবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আব্দুল হাই বলেন, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় যে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের ধারণা আলাদা ছিল। যেহেতু দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন, তাই এই মতভেদ চলতেই থাকবে। কারণ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই এই অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চায়।
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক মিল এবং গভীর রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভারতের অগ্রাধিকার বেশি কার্যকর হতে পারে। তার মতে, গত শতাব্দীর ভারত আর আজকের ভারত এক নয়। ভারত এখন একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি এবং ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদার। এই দুই দেশেরই সাধারণ শত্রু হলো চীন।
তিনি আরও জানান, মালাক্কা প্রণালীতে প্রবেশের পথ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের সুবিধা নিশ্চিতে ওয়াশিংটন এখনও দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
একটি সাধারণ ধারণা আছে, ওয়াশিংটন ঢাকাকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মতভেদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই বেশি প্রভাবশালী মনে হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর ঢাকাকে দিল্লির চশমায় দেখতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ আছে এবং তারা ভারতের প্রভাব ছাড়াই তা সরাসরি এগিয়ে যেতে চায়।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কিনছে। ওয়াশিংটন হয়তো আরও বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চায় এবং বাংলাদেশকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে উৎসাহিত করতে পারে। তার মতে, দিল্লির ওপর নির্ভর না করেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
তিনি আরও যোগ করেন, ভারতও এখন তাদের অবস্থান বদলাতে শুরু করেছে। দিল্লি বুঝতে পারছে যে অন্ধভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ার ফলাফল কী হতে পারে। তাই তারা এখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করে নিজেদের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করছে। ভারত বিএনপির প্রতি কিছুটা ঝোঁক দেখালেও তারা এখন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখবে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন
সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ওয়াশিংটন পোস্টে জামায়াতের ভালো ফল করার যে খবর এসেছে, তাকে বর্তমান কূটনীতিকরা কেবল কাকতালীয় মনে করছেন না। তারা একে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি সংকেত হিসেবে দেখছেন যে, তারা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে জামায়াতকে গুরুত্ব দিতে চায়।
বড় দেশগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি নিয়ে নিজস্ব বিচার-বিশ্লেষণ করে। এখন সব দেশই জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, যার মানে তারা বুঝতে পেরেছে যে এই ধর্মভিত্তিক দলটির রাজনৈতিক শক্তি আছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে একটি নামী পত্রিকায় কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে এমন খবর আসা মানে হলো মার্কিন প্রশাসন বাস্তবে রাজনীতির নানা চাল চালছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি ভারতের জন্যও একটি বার্তা হতে পারে। বাংলাদেশের কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দল যদি দিল্লির বিরোধিতা করে, তবে সেটি ওয়াশিংটনের জন্য ভালো হতে পারে। কারণ, এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র আর ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দেখতে চায় না।
এরই মধ্যে, ২৮ জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকবে। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত।
চীন ইস্যু
দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বড় মিল হলো চীনকে ঠেকানো। দুই দেশই বেইজিংয়ের প্রভাবকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে। আরেকজন সাবেক কূটনীতিকের মতে, এই চীন ইস্যুটিই দিল্লি ও ওয়াশিংটনকে এক জায়গায় নিয়ে আসবে। এই বিষয়টি এতই জরুরি, চীনকে রুখতে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একে অপরের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে এক হয়ে কাজ করতে পারে।


