ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৩৮ জনে। ধসে পড়া বহু ভবন ও ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে দুইজন নিখোঁজ আছেন বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সুনামি সতর্কতা জারি করে এবং উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যেতে বলে। তবে পরে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা জানায়, পর্যবেক্ষণে সমুদ্রপৃষ্ঠে এমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি, যা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এরপর সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৫টা ৫৮ মিনিটে ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের এন্দে শহর থেকে ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-উত্তরপশ্চিমে। মূল ভূমিকম্পের পর কয়েকটি আফটারশকও অনুভূত হয়।
মাউমেরে অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থার প্রধান ফাথুর রহমান জানান, ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সিক্কা, পশ্চিম মাঙ্গারাই ও পূর্ব মাঙ্গারাই- এই তিন প্রশাসনিক অঞ্চল থেকে উদ্ধারকারীরা অন্তত ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। এর মধ্যে মাঙ্গারাইয়ের রেওক গ্রামের ভূমিধসের ধ্বংসস্তূপ থেকে আটটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তিনি জানান, গুরুতর আহত ছয়জনকে দ্রুত কাছের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ফাথুর রহমান আরও বলেন, ভূমিকম্পের ফলে আশপাশের পাহাড় থেকে বিপুল পরিমাণ কাদা নেমে এসে ভূমিধস সৃষ্টি করে। ওই কাদার নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ দুই গ্রামবাসীর সন্ধানে উদ্ধারকারীরা এখনো তল্লাশি চালাচ্ছেন।
পূর্ব নুসা তেঙ্গারা পুলিশের প্রধান রুদি দারমোকো বলেন, ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বহু ভবন ধসে পড়েছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হচ্ছে এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম জটিল হয়ে উঠেছে।
রুদি দারমোকো বলেন, ‘আমরা ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছি, তবে যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে।’
তিনি জানান, ভূমিকম্পের কারণে এন্দে অঞ্চলে ভূমিধস হয়েছে এবং এতে ট্রান্স-ফ্লোরেস মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা পাহাড়ি এই সড়কটি ফ্লোরেস দ্বীপজুড়ে লাবুয়ান বাজো থেকে লারানতুকা পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থানীয় টেলিভিশনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ভূমিকম্পের পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি হাসপাতাল থেকে রোগীদের বাইরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের কর্মীরা শয্যা, স্যালাইন রাখার স্ট্যান্ড ও অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বাইরে নিয়ে যান। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হাসপাতালের বাইরে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রও স্থাপন করা হয়।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, ত্রাণ ও জরুরি সাড়া কার্যক্রমে সহায়তার জন্য একটি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এটি মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার কাজেও ব্যবহার করা হবে।
সংস্থাটি বলেছে, পূর্ব নুসা তেঙ্গারার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আকাশপথে সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই এলাকায় পরিবহন ও যাতায়াতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, নাগেকেও অঞ্চলের প্রায় দুই হাজার গ্রামবাসী বাড়িঘর ছেড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন।

ফ্লোরেস দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় এবং প্রাথমিক প্রতিবেদনে সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
ফ্লোরেস দ্বীপের পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের সিক্কা এলাকার বাসিন্দা ইয়োহানা এম্বু বলেন, শক্তিশালী কম্পনে বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আতঙ্কিত মানুষ উঁচু স্থানের দিকে ছুটে যান।
তিনি বলেন, ‘এখানে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি দেখেছি, মাউমেরে বন্দর টার্মিনালের ওয়েটিংরুমটি ধসে পড়েছে।’
সিক্কার সেন্ট পিটার মেজর সেমিনারির শিক্ষার্থীরা সকালের প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার সময় একটি মিলনায়তনের ছাদ ধসে পড়লে আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। প্রধানত ক্যাথলিক অধ্যুষিত ফ্লোরেস দ্বীপে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে রিতাপিরেত সেমিনারি নামে পরিচিত।
সেমিনারির অধ্যক্ষ রেভারেন্ড গুইডেলবার্টুস টাঙ্গা বলেন, ‘ধসে পড়া ছাদের নিচ থেকে আমাদের শিক্ষার্থী ও সন্ন্যাসিনীরা আতঙ্কে দৌড়ে বেরিয়ে যান।’
তিনি জানান, ভূমিকম্পের সময় একটি ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ায় অন্তত একজন যাজকের পা ভেঙে গেছে।
ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ শুরুতে পূর্ব নুসা তেঙ্গারা, পশ্চিম নুসা তেঙ্গারা, দক্ষিণ সুলাওয়েসি ও দক্ষিণ-পূর্ব সুলাওয়েসি প্রদেশের কিছু অংশে সুনামি সতর্কতা জারি করেছিল। একই সঙ্গে বাসিন্দাদের সমুদ্রসৈকত ও নদীতীর থেকে দূরে থাকতে এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষকে উঁচু স্থানে চলে যেতে বলা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, অগভীর সমুদ্রের নিচে সৃষ্ট ভূমিকম্পটির অবস্থান ছিল ফ্লোরেস দ্বীপের কাছে।
১৭ হাজারের বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়া ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকার আগ্নেয়গিরি ও ভূচ্যুতির রেখাবেষ্টিত ‘অগ্নিবলয়’-এ অবস্থান করার কারণেই দেশটিতে প্রায়ই এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে।
১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে ফ্লোরেস দ্বীপে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জের অংশ ওই দ্বীপে সেই দুর্যোগে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
২০১৮ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ফলে শক্তিশালী স্থানীয় সুনামি সৃষ্টি হয়। এতে উপকূলীয় এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। কম্পনের কারণে মাটি তরল হয়ে পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরের পুরো পাড়া কাদার স্রোতে পরিণত হয়। পালু-কোরো ভূচ্যুতি রেখার ওপর অবস্থিত ওই এলাকায় দুর্যোগে চার হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান।
২০১০ সালে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলের মেন্তাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্রতলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রায় ১০ ফুট বা তিন মিটার উঁচু ঢেউ আঘাত হানে। এতে ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং শত শত বাড়িঘর ধ্বংস হয়।
২০০৪ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার উপকূলে ৯ দশমিক ১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে সুনামি সৃষ্টি হয়। ওই দুর্যোগে ১২টি দেশে প্রায় দুই লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান।


