রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে এক তরুণীকে হয়রানি ও টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একদল যুবকের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উদ্যানের রমনা কালী মন্দিরসংলগ্ন পুকুরপাড়ে এ ঘটনা ঘটে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাবি শিক্ষার্থী শাহরিয়ার তানজিল ও শাহরিয়ার ইসলাম তুষার। যাদের টিএসসি এলাকায় দুই তরুণী ও এক তরুণকে মারধর এবং হেনস্তার অভিযোগে গত ১০ মার্চ ছয় মাসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
অভিযুক্ত তানজিল শুরুতে অভিযোগটি অস্বীকার করলেও পরে দাবি করেন, তার ‘ছোট ভাইয়েরা’ ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত। তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি।
এ ছাড়া, বিষয়টি সংবাদে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবেদককে অর্থের প্রস্তাব দেন তিনি।
ভুক্তভোগী ঢাকা আর্ট কলেজের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, এক বন্ধুর সঙ্গে রমনা কালী মন্দিরসংলগ্ন পুকুরপাড়ে বসে থাকাকালে কয়েকজন যুবক তাদের ঘিরে ধরে। এ সময় একজন নিজেকে ঢাবির শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। পরে তার মোবাইল ফোন নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও ব্যাক্তিগত তথ্য দেখেন এবং পরিচিতি লোকজনদের ফোন দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, অভিযুক্তরা তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা এবং তার বন্ধুর কাছ থেকে আরও ৬০০ টাকা আদায় করেন। পাশাপাশি উপস্থিত অন্যরা আপত্তিকর মন্তব্য করে মানসিকভাবে হেনস্তা করেন।
‘ওরা আমাকে বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে অপমান করেছে। আমার ফোন নিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ঘেঁটেছে, এমনকি পরিচিতদের নম্বরেও কল দিয়েছে’-বলেন তিনি।
ভুক্তভোগী আরও জানান, অভিযুক্তরা নিজেদের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির’ সদস্য দাবি করে ঘটনাটি মিটমাটের আশ্বাস দেন এবং ভবিষ্যতে যোগাযোগের জন্য নিজেদের নম্বর দিয়ে যান।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতে যোগাযোগ করা হলে শাহরিয়ার তানজিল দাবি করেন তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। সেসময় তিনি বলেন, ‘এরকম কিছু তো হয়নি আমার সঙ্গে। দরকার হলে তাকে সামনে আনো। সে যদি মিথ্যা অভিযোগ করে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
পরবর্তীতে রাতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির কক্ষে এসে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে স্বীকার করেন, তার পরিচিত এক ‘ছোট ভাই’ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, বিষয়টি ‘সমাধান’ করতে তিনি নিজেই সেখানে গিয়েছিলেন। তবে জড়িতদের কারও নাম তিনি প্রকাশ করেননি।
তানজিল বলেন, ‘এইগুলো ক্যাম্পাসের ছোট ভাই, এই বিষয়টা বাদ দেই। নিজে সেখানে গিয়ে মেয়েটিকে নিজের পকেট থেকে টাকা ফেরত দিয়েছি, যাতে বিষয়টির সমাধান হয়ে যায়।’
পরবর্তীতে তিনি প্রতিবেদককে অর্থের প্রস্তাব দেন।
শাহরিয়ার তানজিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল শাখার যুগ্ম-আহ্বায়ক ছিলেন। টিএসসিতে নারী হেনস্থার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার পর গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে ছাত্রদল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে অপর অভিযুক্ত শাহরিয়ার ইসলাম তুষারের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
তুষার থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক ছাত্র। সহপাঠীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসে আসার পর তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের কিছু সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয় বলে দাবি করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ শনিবার ভোররাতে টাইমসকে বলেন, ‘তারা ইতোমধ্যেই একটি ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বহিষ্কৃত হয়েছে এবং বর্তমানে আর আমাদের শিক্ষার্থী নয়। ভুক্তভোগী নারী থানায় মামলা করে তার কপি আমাদের দপ্তরে জমা দিলে আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করব।’
উল্লেখ্য, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোররাতে টিএসসি এলাকায় দুই নারীকে লাঞ্ছিত করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরবর্তীতে এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে শাহরিয়ার তানজিল ও শাহরিয়ার ইসলাম তুষারসহ অন্য একজন শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়।


