অনেকটা যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বগুড়া পৌরসভার কর্মকাণ্ড। নানা অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর্জ্য অপসারণের সক্ষমতা যেন হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তিও শুন্যের কোঠায়।
বারবার অভিযোগ দিয়েও ফলাফল পাচ্ছেন না পৌরসভাবাসী।
বগুড়া পৌরসভার আয়তন ২ হাজার ৮৯৮ বর্গ কিলোমিটার। পৌরসভার বয়স প্রায় দেড়শ বছর, তবে এতদিনেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে আসেনি।
২০০৬ সালের আগে বগুড়া পৌরসভা ছিল ১২টি ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ। তখন প্রতিটি মহল্লায় ডাস্টবিন থাকলেও পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে তা তুলে ভ্রাম্যমাণ ডাস্টবিন চালু করা হয়। সিবিওর মাধ্যমে ভ্যানে ময়লা তুলে ট্রান্সফার স্টেশনে রাখা হয়। সেখান থেকে গার্বেজ ট্রাকে ভাগাড়ে ফেলা হয়। এখনো সেই অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।
২০০৭ সালে আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে এটি ২১টি ওয়ার্ডে উন্নীত হয়। যে কারণে এটি দেশের সবচেয়ে বড় পৌরসভা।
বগুড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার পৌরসভার প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রতিদিন গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য অপসারণ করতে হয়। এর জন্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছে ৩৩০ জন, গার্বেজ ট্রাক রয়েছে নিজস্ব তিনটি, ১৭টি ডাম্প ভাড়া করা ট্রাক, বর্জ্য ট্রাকে উঠানোর জন্য স্কিড লোডার রয়েছে দুটি, ভাড়া করা রয়েছে একটি বুলডোজার।
গোটা বগুড়া শহরেই আটটি সেডযুক্ত সেকেন্ডারি ডাম্পিং স্টেশনসহ সেড ছাড়া ১২ হাজার ১৮২টি সিবিও কাজ করে যাচ্ছে। এরাই মূলত বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে ডাস্টবিনে পৌঁছায়। এরপর পৌরসভা তাদের নির্দিষ্ট নিজস্ব গাড়ি দিয়ে সেডযুক্ত ডাস্টবিনে রাখে। ডাস্টবিনে বর্জ্যগুলো রাখতে গিয়ে সিবিওর ভ্যানগুলো ডাস্টবিনে রাখতে না পেরে রাস্তায় রেখে যায়। সেখানে রাস্তার পাশের বর্জ্যগুলো লোডার দিয়ে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানো হলেও ট্রাকের সল্পতা ও স্কিড লোডারের স্বল্পতায় দুই থেকে তিনদিন পর্যন্ত পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

বগুড়া পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাজাহান রিপন বলেন, পৌরসভার বর্ধিত এলাকায় কোন কাজই করা সম্ভব হয় না। শহরের মাত্র আটটি ডাম্পিং স্টেশনে বর্জ্য অপসারণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিন বগুড়া পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ করতে ৪০ থেকে ৫০টি ডাম্প ট্রাক,স্কিড লোডারসহ আধুনিক সরঞ্জামাদি প্রয়োজন। বর্জ্য যা জমা হয় তা এই মুহূর্তে অপসারণের সক্ষমতা বগুড়া পৌরসভার নেই।
ওয়ার্ডগুলোতে কোনো পৌরসভার কর্মী নেই সিবিও দিয়েই কাজ চলে। ভ্যানচালককে সিবিও কমিটি নিয়োগ দেয়। গোটা পৌরসভায় তিনজন সুপার ভাইজার আছে, যারা সব বর্জ্য ব্যবস্থা তদারকির জন্য কাজ করে। চলতি বছর বগুড়া পৌরসভার রাজস্ব বাজেট ৯০ কোটি চার লাখ টাকা এবং উন্নয়ন বাজেট ৩১২ কোটি টাকা ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সপ্তপদী মার্কেট , ফতেহ আলী বাজার, বনানি রেশম উন্নয়ন বোর্ড, ঠনঠনিয়া, সেউজগাড়ী কৃষি অফিস, রেলস্টেশন, শিববাটি শিল্পকলা একাডেমি,সাতমাথা, জজকোর্ট, চ্যালোপাড়া,নিউমার্কেট, কাঁঠালতলা, বিসিক এলাকা, রাজাবাজার মোড়, ফতেহআলী মোড়, শেরপুর ও গোহাইল রোড সংযোগ মুখে আবর্জনার স্তূপ জমে আছে।
স্থানীয় একজন অভিযোগ করে বলেন, ‘বগুড়ার পুরাতন ১২টি ওয়ার্ডে সিবিও এখনো কাজ করছে। এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা প্রতি মাসে নিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। বিভিন্ন সিবিওতে ১০ থেকে ১৫টি ভ্যান রয়েছে। যার অধিকাংশ নষ্ট থাকে কিংবা ময়লা বহনকারী লোক আসে না। তারা দুই থেকে তিনদিন দেরি করে আসাতে আমাদের অসুবিধা হয়।’
বগুড়া শহরের বর্জ্য শহরতলীর এরুলিয়া, নওদাপাড়া ও মহাস্থান এলাকায় তিনটি এলাকায় ডাম্পিং করা হয়। বাপা বগুড়া শাখার যুগ্ম সম্পাদক ফজলে রাব্বি ডলার বলেন, ‘মূলত বর্জ্য পরিবহনের জন্যে বিভিন্ন সেডে বর্জ্য থাকছে। এ কারণে বর্জ্য পদার্থগুলো ডাম্পিং স্টেশনে ফেলতে সময় লাগছে। ফলে পরিবেশ অনেকটাই দূষিত হচ্ছে এবং জনদুর্ভোগ বাড়ছে।’
বগুড়া পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে এখনও ওয়ার্ড অফিস রয়েছে বলে জানান ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কৃষকদল নেতা এনামুল হক সুমন। তিনি জানান, পৌরসভার ওয়ার্ড সচিবরাই সেখানে কাজ চালায়। পৌরসভা নিয়োজিত ক্লিনাররা রাস্তা ও ড্রেন পরিষ্কার করে। তার এলাকায় সিবিওর মাধ্যমে ১৭টি ভ্যান প্রতিদিন কাজ করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বগুড়া পৌরসভার প্রশাসক মাসুম আলী বেগ বলেন, ‘পৌরসভা থেকে সাধ্য মতো বর্জ্য অপসারণের কাজ করা হচ্ছে। তবুও পরিবহন ও যন্ত্রপাতি কম থাকায় কাজ ব্যাহত হয়।’
শিগগিরই বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এজন্য কাজ চলছে। সেগুলো স্থানীয় সরকার বিভাগ পর্যালোচনা করেছে। নীতিগত অনুমোদনে গেজেট প্রজ্ঞাপন আকারে জারি অচিরেই হবে।


