বরিশাল নগরীর যানজট নিরসনে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন বাস টার্মিনাল গত তিন বছরেও চালু করা সম্ভব হয়নি। এখনো বাসের সংখ্যার তুলনায় ছোট নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালে যাত্রী ওঠানামায় দুর্ভোগের পাশাপাশি দিনভর লেগে থাকে যানজট।
বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে বরিশাল নগরীর পুরনো নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল। পুরনো এই টার্মিনালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বরিশালে বাসের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে নথুল্লাবাদ এলাকায় প্রতিনিয়তই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে নগরীর কাশিপুর এলাকায় ৬ একর জমির ওপর তিন পর্যায়ে নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল বরিশাল সিটি কর্পোরেশন (বিসিসি)। প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই। কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে টার্মিনালটি চালুর দাবি করলেও সরেজমিনে দেখা গেছে এর ভিন্ন চিত্র।
বিসিসি’র নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং অন্য দুটি প্রকল্প থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এই নতুন টার্মিনাল। এখান থেকে প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার দূরপাল্লার গাড়ি চলাচলের কথা ছিল। এই উদ্দেশ্যে ১১৩টি বাস কাউন্টার ও যাত্রীদের জন্য অত্যাধুনিক ওয়েটিং রুম তৈরি করা হয়েছে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য এখানে বিপরীতমুখী প্রবেশ ও বাহির পথ রাখা হয়েছে। বিসিসি কর্তৃপক্ষ বলছে, টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে এবং বাস মালিকরা চাইলে এটি এখনই হস্তান্তর করা সম্ভব।
বিসিসি’র নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল বারী জানান, নথুল্লাবাদ টার্মিনালে লোকাল ও দূরপাল্লার বাসগুলো একসঙ্গে থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা সমাধানেই দূরপাল্লার বাসের জন্য নতুন ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যে মেয়র এই কাজ শুরু করেছিলেন তিনি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর কাজ আর এগোয়নি। এখন সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে যা বাস মালিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সাত দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব।
একই ধরণের মত প্রকাশ করেছে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ। তারা জানায়, পৌনে দুই শতাংশ জমির ওপর নির্মিত নথুল্লাবাদ টার্মিনালে মাত্র দুইশ’ বাস থাকার জায়গা থাকলেও সেখানে এখন ৫০০ বাস থাকছে। আগে এই টার্মিনালের সামনের রাস্তা দিয়ে দিনে ১২ হাজার যানবাহন চলত, যা এখন বেড়ে ৩২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন টার্মিনাল চালু করা ছাড়া কোনো বিকল্প দেখছে না পুলিশ বিভাগ।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ডটি বর্তমানে আর ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। এর জায়গা কম হওয়ায় বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন বাসস্ট্যান্ডটি চালু হলে সবার জন্য সুবিধা হবে। এ বিষয়ে তারা বাস মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলবেন।
তবে সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস মালিক গ্রুপ। তাদের মতে, এটি মূলত ট্রাক টার্মিনালের জায়গা। সেখানে বাস নিয়ে গেলে ট্রাক শ্রমিকদের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হবে। তারা দাবি করেন, টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ করতে আরও অন্তত দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। এছাড়া টার্মিনালের মাটি ভরাটের কাজও মানসম্মত হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।
বরিশাল নথুল্লাবাদ বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশারেফ হোসেন বলেন, ওখানে ট্রাক টার্মিনালের জন্য কাউন্টার করা হয়েছে। বাস টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল গড়িয়ার পাড়ে, যেখানে কোনো কাজই হয়নি। বর্তমানে যেখানে বাস নিতে চাওয়া হচ্ছে সেখানে ট্রাকের সাথে বিরোধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানান, সাত দিনের মধ্যে কাজ শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, নতুন টার্মিনালে কোনোভাবেই গাড়ি রাখা বা কাউন্টার করা সম্ভব নয়। এটি এখনো গাড়ি চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। স্ট্যান্ডের মাঝখানে গভীর গর্ত থাকায় বর্ষায় হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে থাকে। টার্মিনাল নির্মাণের নামে টাকা লুটপাটের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে বাস পার্কিং করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টার্মিনালে নির্মিত ১১৩টি কাউন্টারের অর্ধেকের বেশি সাটার ইতিমধ্যে খুলে নেওয়া হয়েছে। অরক্ষিত এই টার্মিনাল ভবনে দুটি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্থায়ী কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। আরসিসি ইয়ার্ডের অবস্থা খুবই নাজুক এবং পুরো এলাকা জঙ্গলে ভরে গেছে। সেখানে যাত্রী ছাউনি বা বিশ্রামাগার নেই।
সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভবন ও বাউন্ডারি দেয়ালসহ আরসিসি ইয়ার্ড নির্মাণে ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি টাকা। এছাড়া ১১৩টি কাউন্টার ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য নির্ধারিত ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার মধ্যে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসবের কার্যকর কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না। সন্ধ্যা হলেই পুরো এলাকা মাদকসেবীদের দখলে চলে যাওয়ায় সংশ্লিষ্টরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
বাস চালক সবুজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা খুব কষ্টে আছেন। কারণ তাদের বিশ্রাম নেওয়ার কোনো জায়গা নেই। রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয় বলে সার্জেন্টদের হয়রানির শিকার হতে হয়। আলমগীর নামে আরেকজন চালক জানান, স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় তারা রাস্তায় রাস্তায় থাকছেন। নতুন টার্মিনালটি সঠিকভাবে চালু হলে তাদের দুর্ভোগ কমত।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বরিশালের নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী এই দুটি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৬০০ বাস যাতায়াত করে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও নতুন টার্মিনালটি চালু না হওয়ায় নগরীর পরিবহন ব্যবস্থায় অচলাবস্থা কাটছে না।


