রোজারিওর সেই ছোটখাটো ছেলেটি, যার হরমোনজনিত সমস্যার কারণে ফুটবলার হওয়া অনিশ্চিত ছিল, সে একসময় পায়ের জাদুতে পুরো পৃথিবীকে শাসন করবে এমনটা কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক রেকর্ড ভাঙা, লা লিগা বা চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফিগুলোকে হাতের খেলনা বানিয়ে ফেলা কিংবা রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ের কীর্তি সবকিছুই লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
একটা সময় সমালোচকেরা বলতেন মেসি ক্লাবের হয়ে যতটা উজ্জ্বল, দেশের জার্সিতে ততটা নন। কোপা আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপের ফাইনালে গিয়েও বারবার ট্রফি ছোঁয়ার দূরত্ব থেকে ফিরে আসা লিওনেলকে নিয়ে ট্রল করতে ছাড়েননি নিন্দুকেরা। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারের পর যখন তিনি চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন, তখন মনে হয়েছিল মহাকাব্যের শেষটা বুঝি ট্র্যাজেডিতে হচ্ছে।
কিন্তু যার গল্প স্বয়ং নিয়তি লেখে, তার শেষটা কি এত সহজে হয়? ফুটবল দেবতা হয়তো মেসির হাতে একটা বিশ্বকাপ না দিয়ে খেলাটার প্রতি অবিচার করতে চাননি। তাই তো তিনি ফিরে এলেন। ২০২১ কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে যে মহাকাব্যের পুনরুত্থান শুরু হয়েছিল, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল স্টেডিয়ামে তা পূর্ণতা পায়। সোনালি ট্রফিটা হাতে নিয়ে মেসির সেই স্বর্গীয় হাসি কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের চোখকে অশ্রুসিক্ত করেছিল। ফুটবল যেন সেদিন তার নিজের ঋণ শোধ করেছিল জাদুকরের কাছে।
আসলে কেবল অতীতের সেই টাইমলাইনটাই বা কেন, বর্তমানও যেন তার জন্য রাজকীয় এক মঞ্চ সাজিয়ে রেখেছে। অথচ আজকের রাতটার শুরুটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আজ ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৯ মিনিট। ডালাস স্টেডিয়ামের গ্যালারিজুড়ে এক লহমায় নেমে এল পিনপতন নীরবতা। পেনাল্টি স্পট থেকে নেওয়া লিওনেল মেসির শটটি যখন পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে গেল, তখন অনেক আর্জেন্টাইন সমর্থক হয়তো নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি তার তৃতীয় পেনাল্টি মিস। এমন একটি রেকর্ড কোনো ফুটবলার চাইবেন না। ঠিক ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালের এই দিনেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি অমর গোল করেছিলেন। এমন দিনে মেসি কি না অনাকাঙ্ক্ষিত এক রেকর্ডের মালিক হয়ে গেলেন। অথচ হওয়ার কথা তো ছিল অন্য কিছু। কে জানে, নিয়তি হয়তো একটু খেলতে চাইল। তবে ফুটবল ঈশ্বর যাকে রাজমুকুট পরাবেন, তাকে কি আর একটি পেনাল্টি মিসের বৃত্তে আটকে রাখা যায়?
মেসি তো মেসিই। ১৮ মিনিটে আরেকটি সুযোগ এল। ডেভিড আলাবা শেষ মুহূর্তে বল কেড়ে নিলেন, অস্ট্রিয়ার গোলকিপার আলেকজান্ডার শ্লাজার দুর্দান্ত সেভ করলেন। মেসি তখনো ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে।
৩৮তম মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাম দিক থেকে একটি ক্রস এল। থিয়াগো আলমাদা বলটা ছেড়ে দিলেন ডামি মুভে। ফাকুন্দো মেদিনার বাড়ানো সেই নিখুঁত পাস বুক দিয়ে নামিয়ে কোনো থামা নেই, কোনো ভাবনা নেই। বাম পায়ের এক জাদুকরী ভলিতে অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে পরাস্ত করলেন মেসি। বল প্রথম স্পর্শেই নিচু কোণে জালে জড়াল। অস্ট্রিয়ার গোলকিপার নড়ার আগেই বল যখন জালের বাম কোণায় আশ্রয় নিল, তখন শুধু ডালাস স্টেডিয়াম নয়, যেন কেঁপে উঠল গোটা ফুটবল বিশ্ব।
জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে পেছনে ফেলে ১৭টি গোল নিয়ে এককভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে গেলেন মেসি। যে ইতিহাস তার হওয়ার কথা ছিল, সেটা হলো। ডালাস ফুটে উঠল। স্টেডিয়ামের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হলো। মেসি দৌড়ে গেলেন, সতীর্থরা ছুটে এলেন। মাঠের কোণে জড়ো হওয়া সেই মানুষগুলো এবং স্টেডিয়ামে আরও যারা কাঁদলেন, তারা সবাই কিন্তু আর্জেন্টাইন ছিলেন না। এই ছবি ফুটবলের আর্কাইভে অনন্তকাল থাকবে। ৩৯ বছর বয়সের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা, মাত্র দুদিন পর জন্মদিন, এই মানুষটা ইতিহাসের পাথরে নিজের নাম খোদাই করলেন।
গ্যালারিভর্তি মানুষের কানফাটানো চিৎকার তখন আচমকাই স্তব্ধ। টানটান উত্তেজনা, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। ঠিক তখন সবুজ গালিচায় শুরু হলো সেই অতিমানবিক জাদু। প্রতিপক্ষের তিন চারজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে শরীরী মোচড়ে বলটাকে যেভাবে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখলেন তা কেবল খেলা নয়, যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো নিখুঁত শিল্পকর্ম। ধারাভাষ্যকার মাইক্রোফোনে চিৎকার করে উঠলেন, আর ফুটবলপ্রেমীরা স্তব্ধ হয়ে ভাবলেন এই মানুষটা কি আসলেই এই গ্রহের?
খেলার শেষ বাঁশির আগমুহূর্তে মেসি যা করলেন, তা আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের দ্বিতীয় গোলের কথাই মনে করিয়ে দিল। ৯০ যোগ ৫ মিনিট। যোগ হওয়া সময়ের শেষ পর্যায়ে হুলিয়ান আলভারেজের একটি শট ঠেকে গেল। সেই রিবাউন্ড থেকে মেসি শট নিলেন, সেটাও ব্লক হলো। তারপর বল ফিরে এল, আবার মেসি। যেন তিনি জানতেন বল পজিশনে ফেরত আসবে, তার আগে তিনি সেখানে হাজির। এবার আর ভুল নেই। বল জালে, আর্জেন্টিনা ২ শূন্য। বিশ্বকাপে মেসির ১৮তম গোল, ক্লোসাকে আরও পেছনে ফেলে দিলেন তিনি।
শেষ মুহূর্তে একটি ফ্রি কিক থেকে হ্যাটট্রিকের সুযোগ এসেছিল, বল পোস্টের পাশ দিয়ে চলে গেল। কিন্তু তাতে কী! এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত দুই ম্যাচে আর্জেন্টিনার পাঁচটি গোল, পাঁচটিই মেসির। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল। এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখার পর আরও একবার ফুটবলবিশ্বের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হচ্ছে সেই পুরোনো সত্যটা। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও মাঠের দখলটা যেভাবে নিজের পায়ে রাখেন, তা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করা ছাড়া উপায় থাকে না।
এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর গ্যালারির গণ্ডি পেরিয়ে চায়ের কাপে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও একই আলোচনা, মেসি যা খেলছেন তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিটি ম্যাচে তিনি যেভাবে ফুটবলে বুঁদ করছেন, তাতে ফুটবল নামক খেলাটা ধন্য হয়েছে।
পেনাল্টি মিস দিয়ে শুরু আর ইতিহাসভাঙা গোল দিয়ে শেষ, এইটুকু সময়ের ভেতরে মেসি এমন একটি চাপ নিলেন, এমন একটি গল্প বললেন যা কোনো চিত্রনাট্যকার লিখতে পারতেন না। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপের মাঠে দুই ম্যাচে পাঁচটা গোল!
এই মানুষটার বয়স বাড়ে না। এই মানুষটার ফুটবল শেষ হয় না। ফুটবল খেলাটা হয়তো যুগে যুগে অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে, কিন্তু এই মানুষটার খেলা দেখার পর মনের গহীন থেকে ফুটবল রোমান্টিকেরা হয়তো আরও একবার বলে উঠছেন, মাঝেমধ্যে মনে হয় ফুটবলটা শুধু অবিশ্বাস্য মেসির জন্যই!


