দীর্ঘ ১৭ বছরের বঞ্চনা ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশের ‘ফুলের রাজধানী’ খ্যাত যশোরের গদখালীতে এখন নতুন সম্ভাবনার হাওয়া বইছে। ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার পর এই জনপদের হাজার হাজার ফুলচাষি এখন স্বপ্ন দেখছেন এক বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির।
বিশেষ করে বিদেশে ফুল রপ্তানি, আধুনিক রেল স্টেশন স্থাপন এবং দীর্ঘদিনের চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার ব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি নতুন সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে এসেছে, তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা, যুগের পর যুগ ধরে চলা পরিবহন ও বিপণন সংকটের অবসান ঘটিয়ে গদখালির ফুল এবার বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয় তুলে ধরবে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি নূর আলম তেমনই একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। নূর আলম জানান, বিগত সরকারের আমলে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারায় তাদের প্রত্যাশা ছিল সামান্য। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি যশোরে এক নির্বাচনি পথসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে পোশাকের মতো যশোরের ফুলও বিদেশে রপ্তানি করা হবে। নির্বাচনে দলটির জয়লাভের পর সেই ঘোষণা এখন এই অঞ্চলের ৪ হাজার মানুষের কাছে এক বিশাল প্রাপ্তির অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে।
এ বছর গদখালির ৬৩০ হেক্টর জমিতে হরেক রকমের ফুলের চাষ হয়েছে। তবে জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে ফুলের বাজার অনেকটা থমকে গিয়েছিল। বছরে সাধারণত পাঁচ মাস ফুলের মূল মৌসুম থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কাঙ্ক্ষিত বেচাকেনা হয়নি বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
নূর আলম জানান, দেশের ফুলের চাহিদার ৭০ শতাংশ গদখালি থেকে মেটানো হলেও বর্তমানে অন্যান্য স্থানে বাণিজ্যিক চাষ শুরু হওয়ায় বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা সিন্ডিকেট ও নীরব চাঁদাবাজি চাষিদের বিপাকে ফেলেছিল। ৫ আগস্টের পর সেই পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখন স্থায়ী সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
আরিফ নামে আরেক চাষি বলেন, তারেক রহমান যশোরে এসে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আমরা সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছি। আমাদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি ধাপে ধাপে আমাদের ফুল বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করবেন।
তবে এই রপ্তানির পথে বড় বাধা জরাজীর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা। গদখালী ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানান, ঝিকরগাছা ও পানিসারার প্রায় ৯০টি গ্রামের মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে এই ফুলের সাথে।
কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকে থাকা গদখালী রেল স্টেশনটি আশির দশকে অব্যবস্থাপনার অজুহাতে অকেজো করে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে ট্রেন থামলেও মালবাহী কোনো সুবিধা নেই।
রেলপথ অকেজো থাকায় চাষিদের বাধ্য হয়ে ট্রাকে ফুল পাঠাতে হয়। দীর্ঘ যানজট ও গরমে ফুলের সতেজতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে গিয়ে পানির দরে পণ্য বিক্রি করতে হয়।
আবু জাফর মনে করেন, গদখালী রেল স্টেশনটি যদি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ কোচের ব্যবস্থা নিয়ে পুনরায় চালু হয়, তবে যাতায়াত খরচ অর্ধেকের নিচে নামবে এবং বিদেশের বাজারে মান ধরে রাখা সম্ভব হবে।
এদিকে গদখালী ফুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল খায়ের জানান, এ বছর বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। সামনে একুশে ফেব্রুয়ারি থাকলেও রমজানের কারণে কেনাবেচা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না।
এমন পরিস্থিতিতে চাষিদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, উন্নত হিমাগার স্থাপন এবং বিদেশ থেকে নতুন জাতের বীজ আমদানির সহজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি গদখালীকে একটি ‘কৃষি পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি এখন জোরালো হচ্ছে। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো ও উন্নত রাস্তাঘাট তৈরি হলে ফুল বিক্রির পাশাপাশি পর্যটন থেকেও বিশাল রাজস্ব আয় সম্ভব। গদখালির চাষিরা বিশ্বাস করেন, নতুন সরকারের সদিচ্ছায় এই ‘ফুলের স্বর্গ’ একদিন দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।


