ফিলিস্তিনকে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা এবং সবশেষ পর্তুগাল।
গাজায় চলমান ইসরায়েলি হামলায় বিশ্বজুড়ে নিন্দা তীব্র হচ্ছে। এরই মধে্য এ সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি, গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি কমিশনও ‘ইসরায়েলকে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত’ করেছে।
এদিকে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ইসরায়েলের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’
এ প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনকে বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি করেছে নতুন আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে, ইউরোপের এমন স্বীকৃতির অর্থ কী? বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রভাব কী? বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ফিলিস্তিনকে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতির নানা দিক।

রাষ্ট্র কী
১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশনের আলোকে আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্র হওয়ার জন্য চারটি শর্ত পূরণ করতে হয়। সেগুলো হলো- স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, কার্যকরী সরকারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতা।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব শর্তই পূরণ করেছে ফিলিস্তিন। সীমানা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাদের স্থায়ী জনসংখ্যা ও ভূমি রয়েছে। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের দখল করা পশ্চিম তীর ও গাজার পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমকেও সাধারণত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়।
কূটনৈতিক প্রভাব
‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রতীকী হলেও এর কিছু বাস্তব প্রভাব রয়েছে। কানাডায় আইনের শিক্ষক সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা আরদি ইমসেইস বলেন, এই স্বীকৃতির ফলে বিভিন্ন দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে করা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, যেন তা ফিলিস্তিনির সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন না করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাণিজ্য সংক্রান্ত চুক্তিগুলোর কথা। সেসব পর্যালোচনা করা দরকার হতে পারে যেন সেখানে ইসরায়েলের অবৈধভাবে দখল করা বসতি থেকে আসা পণ্য অন্তর্ভুক্ত না থাকে।
আন্তর্জাতিক আদালতে ফিলিস্তিনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা আইনজীবী পল রেইকলারের মতে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে অবৈধ বসতি কার্যক্রমে সরাসরি সহায়তা করা চুক্তিগুলো বেআইনি বলা যাবে।

স্বীকৃতির বৈশ্বিক গতি
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে দেড়শটি দেশ ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ মিত্র ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগালও এই পথে হেঁটেছে।
স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের গুরুত্ব অনেক, কারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য তারা, যেখানে এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের সদস্যপদের বিরোধীতা করছে।
বর্তমানে জাতিসংঘে পর্যবেক্ষক পদে আছে ফিলিস্তিন। ওয়াশিংটনের সমর্থন না পেলে তাদের পূর্ণ সদস্যপদের আবেদন আর এগোবে না।

কেন এখন স্বীকৃতি?
প্রায় প্রতিটি দেশের ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ ভিন্ন। বেলজিয়াম স্বীকৃতি দিয়েছিল বন্দীদের মুক্তি এবং হামাসের শাসন থেকে বাদ পড়ার শর্তে। যুক্তরাজ্য এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধবিরতি না আনার জন্য আর কানাডা একে শান্তিপূর্ণ দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের অংশ হিসেবে দেখেছে।
যদিও সমর্থকরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ প্রধানত প্রতীকী, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করে এবং দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথ খুলে দেয়। রেইকলার বলেন, ‘ছোট ছোট পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ।’ এমন আবহে বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি ইসারায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ‘রাজনৈতিক চাপ’ বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা
ট্রাম্প প্রশাসন সবসময়ই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার বিরোধিতা করে এসেছে। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে ‘ওই বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তার মতানৈক্য’ রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি বিরোধী হলেও তা বিভিন্ন দেশের সরকারকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি।


