জাতীয় ফলমেলায় কেবল তাজা ফল নয়, আছে ফল থেকে তৈরি খাবারও, যার মধ্যে একটি হলো কাঁঠালের বার্গার।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন মাঠে তিন দিনের এই মেলায় একদিকে যেমন দেখা মিলছে বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রচলিত ফলের, অন্যদিকে উঠে আসছে নতুন জাত উদ্ভাবন, বিদেশি ফলের দেশীয় চাষ, সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং রপ্তানির সম্ভাবনার গল্প।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি স্টলে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের উপাদেয় খাবারের দেখা মিলল, যা বহু বছর ধরেই দেশে আলোচনায় আছে।
কাঁঠাল থেকে তৈরি বার্গার কেবল নয়, বিরিয়ানি, কাবাব, চিপস, পেস্ট্রি, পুডিং, পাটিসাপটা, কাটলেটসহ নানা ধরনের খাবার প্রদর্শন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি তাল, আম, ডাব, তরমুজ ও আমলকী থেকে তৈরি পায়েস, পিঠা, বড়া, পুডিং, ক্যান্ডি ও বিভিন্ন শুকনা খাদ্যপণ্যও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফলভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ একদিকে যেমন কৃষিপণ্যের অপচয় কমাতে পারে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য নতুন বাজার ও বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে মৌসুমি ফল সংরক্ষণ করে সারা বছর বাজারজাত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের পণ্যের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য।
এত ফল আছে দেশে!
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে নিয়ে জাতীয় ফল মেলায় গিয়ে স্টলে স্টলে ঘুরে ফলের নাম শেখাচ্ছিলেন জিনিয়া কবির। তবে মেয়েকে চেনাতে গিয়ে নিজেই অবাক হয়ে যান। কারণ, দেশে এত ধরনের ফল আছে, তা জানা ছিল না তারও।
‘অনেক ফল আছে যেগুলোর নামই আগে শুনিনি। আবার কিছু ফল ছোটবেলায় দেখেছি, কিন্তু এখন আর সচরাচর চোখে পড়ে না,’ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন তিনি।
জিনিয়ার এই বিস্ময়ই যেন জাতীয় ফল মেলা-২০২৬-এর মূল চিত্র।
কৃষি ও মৎস্য-প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ উদ্বোধন করা মেলায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৭৬টি স্টল অংশ নিয়েছে। শনিবার পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-বিএডিসির স্টল। প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক (আরবান সেলস) বশির আহমেদ জানান, বিএডিসির বিভিন্ন উদ্যান উন্নয়ন কেন্দ্র ও এগ্রো সার্ভিস সেন্টার থেকে সংগ্রহ করা ১৪৩ ধরনের ফল প্রদর্শন করা হচ্ছে এবারের মেলায়। এর মধ্যে শুধু আমেরই রয়েছে ৩০টি প্রজাতি।
‘পাহাড়ি অঞ্চল, উত্তরবঙ্গ, ঢাকা ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে এসব ফল সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশের ফলের বৈচিত্র্য এক জায়গায় তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য,’ বলেন তিনি।
প্রচলিত ফলগুলোর মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস ও মাল্টা। কাউ ফল, মাকাল ফল, ডেউয়া, করমচা, রামবুটান, থাই লংগান, অ্যাভোকাডো পার্সিমনও খুব একটা অচেনা নয়। তবে লুকলুকি, চাপালিশ, বিলিম্বি, পশুর ধোতল, কাঁকড়া, খুদি জাম নামে যে দেশে ফল আছে তা এই মেলায় না এলে হয়ত জানাই হতো না দর্শনার্থীদের।

বশির বলেন, কাউ ফলে প্রচুর ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। মাকাল ফল সরাসরি খাওয়ার জন্য খুব পরিচিত না হলেও এর ঔষধি গুণ রয়েছে এবং পেটের পীড়া ও ডায়রিয়াসংক্রান্ত বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
দীর্ঘ গবেষণা ও উদ্ভাবন
ফলের এই বৈচিত্র্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা ও উদ্ভাবনের প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানী তরিকুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশে ৩৯ ধরনের ফলের ১০১টি অবমুক্ত জাত রয়েছে। পাশাপাশি আরও কিছু নতুন ফলের লাইন নিয়ে গবেষণার প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন।
তারা জানান, দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করা ফলের গুণাগুণ যাচাই করে সেগুলো মেলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রাঙামাটির রাইখালী এলাকা থেকে সংগ্রহ করা একটি বিশেষ ফলের লাইন নিয়ে গবেষণা চলছে, যা স্থানীয় মানুষ তালের শাঁসের মতো খেয়ে থাকেন। ফলটি এখনও বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হয়নি।
গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কয়েকটি বিরল ফল। এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজে জনপ্রিয় ব্রেডফ্রুট বা রুটি ফল অন্যতম। বিজ্ঞানীরা জানান, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এই ফল ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক হিসেবে পরিচিত। গাজীপুরে এর একটি বড় গাছ রয়েছে এবং বর্তমানে রাঙামাটিতে এর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। ফলটির ছাল ছাড়িয়ে ভেতরের শাঁস সিদ্ধ করে রুটির মতো খাওয়া যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পরীক্ষাধীন ‘ভেরিকেটেড মাল্টা’ নিয়েও কাজ করছেন গবেষকরা। এটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ভালো ফলন দিলে নতুন জাত হিসেবে অবমুক্ত করা হবে।
গবেষকদের মতে, মাল্টা সারা দেশেই চাষ করা সম্ভব হলেও পঞ্চগড় ও চুয়াডাঙ্গার মতো শীতল এলাকায় এর ফলন বেশি ভালো হয়।
দেশে বিদেশি ফলের চাষ
মেলায় আরেকটি আলোচিত বিষয় বিদেশি ফলের চাষ। বশির আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশে ড্রাগন ফল ও রামবুটানের চাষ দ্রুত বাড়ছে। সৌদি আরবের জনপ্রিয় আজওয়া ও চুকারি খেজুরও এখন বাংলাদেশের মাটিতে উৎপাদিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গাবতলী ও কাশিমপুরের মাতৃবাগানে এসব খেজুরের সফল চাষ হয়েছে। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে চারা উৎপাদন করে সেগুলো কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’
এবারের ফল মেলার প্রতিপাদ্য—‘করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’।
বশির বলেন, দেশে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফলের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে মৌসুমে উৎপাদিত ফল সংরক্ষণ করা না গেলে বছরের একটি বড় সময় পুষ্টি ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে সারা বছর ফল উৎপাদন ও সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘কাটিমন’ নামে একটি আমের জাত মূল মৌসুম শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় গাছে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফলের প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সংরক্ষণে দীর্ঘ চেষ্টা
ফল সংরক্ষণে গবেষকরাও কাজ করছেন। বারির বিজ্ঞানীরা জানান, কাঁঠাল, আম, ড্রাগন ফল ও আলুবোখরা থেকে জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরির প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে এক বছর পর্যন্ত পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এমনকি তালের শাঁসও দীর্ঘদিন সংরক্ষণের পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে।
গবেষকদের মতে, আম, পেয়ারা, কাঁঠাল ও ড্রাগন ফল বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে। রপ্তানিযোগ্য আম প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বিএডিসি ভেপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। গাবতলীতে প্রসেসিং সেন্টার এবং বিমানবন্দরে কোল্ড স্টোরেজ সুবিধাও রয়েছে, যা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ব্যবহার করতে পারে।


