দেশের বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদলের প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ১০টি সচিব পদ এখনো শূন্য রয়ে গেছে। নতুন সরকারের প্রশাসনিক পুনর্গঠনের গতি নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, মেধার ভিত্তিতেই এই নিয়োগগুলো সম্পন্ন হবে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, সরকার আসলে রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত ব্যক্তিদেরই এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে খুঁজছে।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া ৯ জন সচিব ও সিনিয়র সচিবের চুক্তি বাতিল করা হয়। একই দিনে আরও তিনজন সচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত করায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি হয়ে যায়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কোনো স্থায়ী সচিব নেই।
মন্ত্রণালয়ের বাইরে পরিকল্পনা কমিশনের তিনটি সদস্য পদ, বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, ভূমি আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকের মতো উচ্চপর্যায়ের পদগুলোও এখন পর্যন্ত অপূর্ণ রয়ে গেছে।
দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করার পর এখন প্রশাসনকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বিশ্লেষকদের মতে, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক আনুগত্যকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান মনে করেন, বিএনপি প্রায় ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় তারা এখন বোঝার চেষ্টা করছে কারা তাদের নীতি কার্যকর করতে পারবে এবং কাদের ওপর ভরসা করা যায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ সময় সচিব পদ খালি থাকলে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ ব্যাহত হয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। এছাড়া পদোন্নতি প্রত্যাশী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
প্রশাসনের ভেতরেও একই ধরনের সুর শোনা যাচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, সরকার এমন কর্মকর্তাদের খুঁজছে যারা বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী, যাতে করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সহজে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
তবে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার ভিন্ন মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, তড়িঘড়ি করে ভুল সিদ্ধান্ত এড়াতেই সরকার কিছুটা সময় নিচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একদিনে নিয়োগ দিয়ে আবার তা বাতিলের যে উদাহরণ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার সম্ভবত সেই পথে হাঁটতে চায় না।
বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী, একটি মেধাতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি হবে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এই প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং সততা ও যোগ্যতাই হবে মূল ভিত্তি। তিনি পদ খালি থাকার বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা খোঁজার অভিযোগটি সঠিক নয়।
এদিকে প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলো পেতে সচিবালয়ে ব্যাপক তদবির শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক জ্যেষ্ঠ আমলা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নিজেদের পক্ষে সুপারিশ পাঠাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো দলের তকমা গায়ে থাকলে সেই দল ক্ষমতায় থাকাকালীন ভালো পদায়ন পাওয়া যায়, তবে সরকার পরিবর্তন হলে ওএসডি হওয়ার মতো ঝুঁকিও তৈরি হয়।
বর্তমান এই রদবদলের আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও প্রশাসনে বড় পরিবর্তন এসেছিল। সেই সময় ১৯ জন সিনিয়র সচিব ও সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল এবং অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। তখন অভিযোগ উঠেছিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের বেছে বেছে ভালো পদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নতুন সরকার সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে কতটুকু মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন সাজাতে পারে, তা দেখার অপেক্ষায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।


