ফুলের হাসিতে স্বপ্ন বুনছেন সিংগাইরের চাষিরা

ফুলের হাসিতে স্বপ্ন বুনছেন সিংগাইরের চাষিরা
Advertisement
Advertisement

ফেব্রুয়ারি মাস এলেই রঙের মেলায় সেজে ওঠে মানিকগঞ্জের সিংগাইর। পহেলা ফাল্গুনে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও জাতীয় শোক দিবস-এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিবসকে কেন্দ্র করে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার ফুলচাষি ও ব্যবসায়ীরা। এবার এই তিন দিবসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী বিজয়ী প্রার্থীদের শুভেচ্ছা জানানোর বাড়তি চাহিদা, যা ফুল বিক্রির পালে নতুন হাওয়া দিচ্ছে।

ভোরের কুয়াশা ভেদ করে উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন হাসছে গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস ও রজনীগন্ধা। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আসন্ন দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সিংগাইর থেকে প্রায় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে।

সিংগাইরের এই ফুল যেমন শহরের পথে পথে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে, তেমনি সচল রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাও। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামোগত সহায়তা ও ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে ফুলচাষ এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

বর্তমানে উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর ও জয়মন্টপের ভাকুম, শায়েস্তা ইউনিয়নের নীলটেক, তালেবপুর ইউনিয়নের ইরতা ও নতুন ইরতা এবং জার্মিত্তা ইউনিয়নের পানিশাইল এলাকাগুলো ‘ফুলপল্লী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এসব এলাকার মাঠে মাঠে ফুলের সমারোহ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্যই নয়, বদলে দিচ্ছে স্থানীয় আর্থসামাজিক চিত্রও।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিংগাইরে ৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। উৎপাদিত গোলাপ, জারবেরা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, স্টার, রজনীগন্ধা ও গাঁদা ফুলের সিংহভাগ সরবরাহ করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজারে।

উৎসব যত ঘনিয়ে আসছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফুলের দাম। বর্তমানে প্রতিটি দেশি গোলাপ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, জারবেরা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গ্লাডিওলাস ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং রজনীগন্ধা ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, বিশেষ দিবসগুলোতে এই দাম আরও বাড়তে পারে। কৃষি অফিস ও বাজার সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই তিন দিবসকে ঘিরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকার ফুল বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে লাভের স্বপ্নে বিভোর থাকলেও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে চিন্তিত কৃষকরা। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আয়ের একটি বড় অংশই খরচ হয়ে যাচ্ছে। ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর এলাকার অভিজ্ঞ ফুলচাষি মজিদ জানান, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে ফুল চাষ করছেন। চলতি মৌসুমে ১৫ বিঘা জমিতে চায়না গোলাপসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করেছেন তিনি। মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করলেও সব খরচ বাদে লাভ থাকে মাত্র ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।

মজিদ বলেন, এ বছর গোলাপে ছত্রাকের আক্রমণ এবং কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে আসন্ন তিন দিবসে ফুলের ভালো দাম পেলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।

একই এলাকার চাষি ডাব্লু ও সিরাজ মিয়া জানান, তারা সারা বছর এই বিশেষ সময়টার জন্যই অপেক্ষা করেন। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফুলের রং ও আকার বেশ ভালো হয়েছে। তবে তারা বলেন, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। সঠিক দাম না পেলে এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় ফুলচাষে পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফোর্ডনগর এলাকার অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী সোলায়মান পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ফুল চাষে কাজ করছেন। তিনি জানান, শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরির কারণে তিনি এবং তার তিন ভাই মিলে জমি পরিচর্যা ও ফুল তোলার কাজ করছেন। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবারের সঙ্গে কাজ করে তারা আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন।

পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলো থেকে প্রচুর আগাম অর্ডার আসছে। তবে পরিবহন ও শ্রম খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার ঝুঁকিও বাড়ছে। সময়মতো ফুল বাজারে পৌঁছাতে পারলে লাভের আশা করা যায়।

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, সিংগাইরে ফুলচাষ এখন একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

এই কৃষি কর্মকর্তার মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও ফুল সংরক্ষণের সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা ভবিষ্যতে আরও বেশি লাভবান হবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad