ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের প্রশাসন ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন মুখোমুখি অবস্থানে। বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ জামায়াতের পক্ষ নিচ্ছে, ফলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ থাকছে না।
শেষ মুহূর্তে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর শঙ্কাও করছে দলটি, যার পাল্টা জবাব দিচ্ছে কৌশলী জামায়াত। তারাও সরকার ও বিএনপিকে চাপে রাখতে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে।
রোববার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইসির কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে। উভয় দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর বিষয়টি এখন ব্যাপক আলোচনায়।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্যমতে, নির্বাচন সামনে রেখে গত ৮ ও ৯ এবং ১৩ নভেম্বর ৫২ জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেয় সরকার। এ ছাড়া ২৬ নভেম্বর ১৭০ জন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং ১ ডিসেম্বর ৭৭ জন ইউএনও নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ২৬ নভেম্বর ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদায়ন করা হয়। ২ ডিসেম্বর লটারির মাধ্যমে দেশের ৫২৭ থানায় অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিয়োগ দেওয়া হয়। ৪ ডিসেম্বর ঢাকারও ৫০ থানায় ওসি রদবদল করা হয়। পাশাপাশি তফসিল ঘোষণার দিন ১১ ডিসেম্বর পুলিশের ৩০ ডিআইজি ও ৯ অতিরিক্ত ডিআইজিকে বদলি করা হয়।
অতীতের নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পর বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে আবারও বদলি করা হয়। প্রশাসনিক সক্ষমতা প্রমাণে অনেক ক্ষেত্রে সামান্য অভিযোগ পেলেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার নজির রয়েছে।
বিএনপির ধারণা, তফসিল ঘোষণার দিন পর্যন্ত পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ ‘জামায়াতের’ অনুগত। বিশেষ করে পোস্টাল ব্যালটে নিজেদের প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিচের দিকে ছাপানো এবং প্রবাসীদের মধ্যে তা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর দলটি নড়েচড়ে বসে। আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে প্রবাসীরা যে পোস্টাল ভোট দেবেন, সেখানে অনিয়মের শঙ্কা করছে বিএনপি।
রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইসি অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। বিষয়গুলো সিইসিকে জানানো হয়েছে। আমরা চাই, ইসি যেন নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা একটি দলের পক্ষে ন্যক্কারজনকভাবে কাজ করছে। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে তদন্ত করে তাদের প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছি। নির্বাচন কমিশনের কতিপয় সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ পেয়েছি।’
পোস্টাল ভোট প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই ব্যালট পেপার সঠিক নয়। এখানে পক্ষপাতিত্ব হয়েছে এবং একটি দলকে বিশেষভাবে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।’
বিএনপির একাধিক নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসন ঢেলে সাজানোর কথা থাকলেও ‘বিশেষ কারণে’ ইসি তা করেনি।
এদিকে বিএনপি যখন প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান, তখন জামায়াতে ইসলামী সরকার ও ইসিকে চাপে রাখতে চাইছে। দলটি বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলছে, সরকার একটি বড় দলকে বিশেষ সুযোগ দিচ্ছে।
রোববার বিকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠক শেষে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় তৈরি হবে।’
তিনি বলেন, সারা দেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতের বিষয়টি এখন দৃশ্যমান। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা এসপি ও ডিসিরা, যারা একই সঙ্গে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের একটি তালিকা করা হলেও তা এখনো ইসিকে জানানো হয়নি।
তাহের অভিযোগ করেন, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে একটি দলের শীর্ষ নেতাকে ঘিরে সরকারের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেওয়ার প্রবণতা নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, ‘কারও নিরাপত্তা বা প্রটোকলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের প্রতিও একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।’
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এবার নির্বাচনের বাইরে। ফলে বড় দল বিএনপি ও জামায়াতের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ কেমন হবে, তা নিয়ে ভোটার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


