সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রশাসনিক কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সরাসরি হস্তক্ষেপ এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একাধিক পক্ষের অভিযোগ, ডাকসু এবং হল সংসদের কিছু কর্মকাণ্ড সরাসরি ডাকসুর গঠনতন্ত্রের পরিপন্থী। সমালোচকদের একাংশের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন্দ্রীয় সংসদকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে অগণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ডাকসু শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদল হলেও আইনিভাবে স্বীকৃত, তাই শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছাড়া নিরাপদ ক্যাম্পাসের লক্ষ্য শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে এই বিতর্কের সূচনা হয়। এই অভিযানের নেতৃত্বে থাকলেও ডাকসুর এখতিয়ার, ক্ষমতা এবং কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
ডাকসুর প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেল থেকে সদস্য পদে নির্বাচন করা ইসরাত জাহান ইমু অভিযোগ করেন, ‘ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের উচ্ছেদ অভিযানের সময় এক ভ্রাম্যমাণ দোকানদারকে বাধা দেন এবং “শারীরিকভাবে হেনস্তা” করেন।’
এ বিষয়ে ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৯-৯০) মুশতাক হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের ও দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করতে গঠনতন্ত্রের সীমাবদ্ধতার কথা ভাবার প্রয়োজন না হলেও ডাকসুকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করছে প্রশাসন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসুকে গণতান্ত্রিক সংগঠন হিসেবে নয়, বরং প্রশাসনিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ডাকসুর কাছ থেকে আমলাতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যাশিত নয়, তাদের উচিত শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে কাজ করা।’
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মুসাদ্দিকুর রহমান রিয়াদ বলেন, ‘নিরাপত্তার নামে কাউকে “মারধর করা” মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ, তবে কাউকে মারধর করার অধিকার তাদের নেই।’
‘তারা কি নিরাপত্তার নামে মব ভায়োলেন্সকে স্বাভাবিক করতে চাচ্ছে’, বলেন তিনি।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, ‘যে কাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, সেটি তাদেরই করা উচিত। ডাকসু প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে পারে, তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাবির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘ডাকসুর এ ধরনের হস্তক্ষেপ এক ধরনের “কর্তৃত্বপরায়ণতার” প্রকাশ কেননা এসব বিষয়ে দেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রক্টরিয়াল বডি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডাকসু যদি এসব দায়িত্ব নিতে শুরু করে, তাহলে অতীতে ছাত্রসংগঠনগুলো যেভাবে কর্তৃত্বপরায়ণ ছিল, ডাকসুও সেই একই পথে হাঁটবে।’
এ বিষয়ে ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাকসু এটি স্টুডেন্ট বডি এবং তারা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে। তারপর ৭৩-এর অধ্যাদেশে যেভাবে উল্লেখ আছে, ডাকসু একটা আইনি বডি, যেটা আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।’
তিনি বলেন, ‘নিরাপদ ক্যাম্পাস মানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা। তাই শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এটি শতভাগ বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব না।’
‘প্রশাসনের অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের সমর্থনেরই একটা রিফ্লেকশন’, বলে দাবি করেন তিনি।
ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের টাইমসকে বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ডাকসুর মূল কাজ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করা, সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ক্যাম্পাস রক্ষার স্বার্থে আমরা প্রশাসনের সমন্বয়ে কাজ করছি, এ বিষয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাচ্ছি।’
এ ছাড়া, গত ১২ সেপ্টেম্বর সূর্যসেন হলের একটি দোকানে এক কেজি টেস্টিং সল্ট পাওয়ায় দোকানদারকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেন হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) আজিজুল হক।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ জানান, জরিমানা করার এখতিয়ার তাদের নেই, হল প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করলে সেটি প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে।’


