অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরে লঘুদণ্ড ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আসামিরা প্রকাশ্যে গুলি করেছিল, সেটা প্রমাণিত হয়েছে, ওয়াইড স্প্রেড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক অ্যাটাক প্রমাণিত হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে; তারপরও অল্প সাজা দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পাঁচজনের স্বল্প মেয়াদী কারাদণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় সোমবার তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এই মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন জনের মৃত্যুদণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, স্বল্প মেয়াদী কারাদণ্ডের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করবে এবং মৃত্যুদণ্ড চাইবে। আদালতের আদেশ মানার বাধ্যবাধকতার কথা স্বীকার করলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেহেতু আপিলের ফোরাম আছে, কম সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আমরা আপিল করব। আমরা মৃত্যুদণ্ড চাইব।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ভিডিওতে যাদের গুলিবর্ষণ করতে দেখা গেছে, যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না, অথচ তারা অন্যদের রাইফেল নিয়ে গুলি করেছে, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম সাজা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, আদালতের আদেশ শিরোধার্য, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে।
এই মামলাকে সাধারণ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মার্ডারের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হয়, কার গুলিতে কে মারা গেছে। কিন্তু এখানে হাজার হাজার রাউন্ড বুলেট নিক্ষিপ্ত হয়েছে, শত শত, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে এবং হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে কার গুলিতে কে মারা গেছে, তা প্রমাণের দরকার নেই। তিনি যোগ করেন, এই প্রমাণ না থাকায় কেউ সাজা থেকে রেহাই পেতে পারে না; এটাই আইনের বিধান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি। সুতরাং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা মনে করি, এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’
আইনি কাঠামোর ব্যাখ্যায় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, ট্রাইব্যুনাল অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অথবা অন্য কোনো সাজা দিতে পারে। এখানে প্রথম বিবেচনা মৃত্যুদণ্ড, তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে অন্য সাজাও দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বিবেচ্য বিষয়, যাদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সাজা যথার্থ হলো কিনা।
রায়ের বার্তা নিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, এই রায়ের বার্তা হচ্ছে, সবাইকে আইন মানতে হবে, কেউ আইনের ঊর্ধে নয়। কোনো বেআইনি কমান্ড মানতে রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বাধ্য নন। প্রত্যেককে আইন অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি বেআইনি কাজের নির্দেশ দেয়, তা অমান্য করার অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে, কারণ সেটি মানতে কেউ বাধ্য নন।
তার ভাষায়, ‘এই রায় একটি সতর্কবার্তা। চাকরি বা প্রমোশনের লোভে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অন্যায় আদেশ পালন করে কেউ অপরাধ করলে তিনি পার পাবেন না। তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে এই মেসেজই দেওয়া হয়েছে।’


