২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে। এরপর যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী।
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এই ক্ষমতা গ্রহণকে নৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার এক নতুন আশা জেগেছিল জনমনে।
অনেকেই তখন মেনে নিয়েছিলেন যে অর্থবহ পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে। আমলাতন্ত্র, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং বিচার বিভাগের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পূর্ববর্তী শাসকগোষ্ঠীর অনুগত ছিল। সাধারণ মানুষ ধৈর্য ধরেছিল এই বিশ্বাসে, দীর্ঘ ১৬ বছরের জরাজীর্ণ ব্যবস্থা এক নিমেষে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়।
২০২৫ সালের শুরুতেও এই ইতিবাচক মনোভাব বজায় ছিল। ১৬ বছরের রাজনৈতিক কেন্দ্রীয়করণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় কাটিয়ে ওঠার জন্য এই বছরটিকে সংস্কারের একটি মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে বছরের সময় যত গড়িয়েছে, সেই আশাবাদ ততই ম্লান হতে শুরু করেছে।
আছে সংস্কারের কাঠামো, নেই গতি
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সংস্কারকে সামনে রেখেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রশাসন, শ্রম, স্বাস্থ্য, ভূমি, গণমাধ্যম, নারী ও দুর্নীতি দমনসহ ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে এই কমিশনগুলো তাদের সুপারিশ জমা দেয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কিছু ছিল সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত এবং কিছু ছিল অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাস্তবায়নের যোগ্য।
সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরির জন্য ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ নামে একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয় এবং একটি সংস্কার সনদ তৈরি করা হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে বেশ কিছু প্রস্তাবের ওপর গণভোট করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের গতি ছিল খুবই ধীর। হাতেগোনা কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন ছাড়া বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার চোখে পড়েনি। বিশেষ করে শিক্ষা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো কমিশন গঠন না করায় বছরজুড়ে সমালোচনা সইতে হয়েছে সরকারকে।
বিচার, নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠানের আংশিক পরিবর্তন
বিচার বিভাগে প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং কিছু আইন সংশোধন করে স্বাধীনতা ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় পর্যায়ে আদালতের পরিধি বাড়ানো, মামলার জট কমানো এবং বিচার বিভাগীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো মৌলিক বিষয়গুলো থমকে ছিল। নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি সংশোধন করা হলেও দলীয় স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হলেও সমালোচকদের মতে এটি প্রতিষ্ঠানটির ওপর তদারকির ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি নতুন কমিশন গঠন করা হলেও এর ওপর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ আগের মতোই রয়ে গেছে। জনপ্রশাসন সংস্কারের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা চললেও সরকারের আকার কমানো বা পদোন্নতির স্বচ্ছ ব্যবস্থার মতো গভীর পরিবর্তনগুলো অস্পৃশ্য থেকে গেছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও আতঙ্ক
সংস্কারের গতি ধীর হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল দ্রুত ও দৃশ্যমান। ২০২৫ সাল জুড়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সাংস্কৃতিক ও সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং গণপিটুনির মতো ঘটনা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বছরের শেষ সপ্তাহগুলোতে ঘটে যাওয়া কিছু বড় ঘটনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেওয়ার অক্ষমতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
মব ভায়োলেন্স বা গণসহিংসতা এই বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যত্রতত্র বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগ, ঘরবাড়িতে হামলা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করার মতো ঘটনা প্রশাসনের কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘শূন্য সহনশীলতা’র কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ ছিল অনিয়মিত। এমনকি সেনাবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে নামানোর পরেও হত্যা, ডাকাতি ও যৌন সহিংসতার মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক দূর হয়নি।
স্থিতিশীল অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংকট
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা প্রশংসা পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অস্থিতিশীলতা এবং রিজার্ভ সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে তারা সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা ভারসাম্য আনতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। তবে এই অর্জনগুলো মূলত বাইরের সহায়তায় হয়েছে, দেশের ভেতরে নতুন বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান সেভাবে তৈরি হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি কোনো অর্থনৈতিক রূপরেখা না থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো দ্বিধা রয়ে গেছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিসর
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বছরজুড়েই উদ্বেগ দেখা গেছে। শত শত সাংবাদিক আইনি হয়রানি ও হুমকির শিকার হয়েছেন। অনেক সংবাদমাধ্যম জোরপূর্বক দখল বা নেতৃত্বের পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গণমাধ্যম দমনের যে সংস্কৃতি ছিল, তা এই সরকারের আমলেও বজায় থাকায় অনেকে হতাশ হয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করার বদলে শুধু পক্ষ পরিবর্তন হয়েছে।
একটি বছর ও অপূর্ণ প্রত্যাশা
২০২৫ সালের শেষে এসে প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন-এই তিন দায়িত্ব দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। সব ক্ষেত্রে কিছু কাজ শুরু হলেও বাস্তবায়নের অভাবে জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। যে বছরটি এক নতুন শুরুর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা শেষ হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা ও কাঠামোগত অমীমাংসিত সমস্যা নিয়ে। শুরুতে পাওয়া বিপুল জনসমর্থন এখন ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাওয়া সুযোগটি রাষ্ট্র সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে নাকি তা চিরতরে হারিয়ে গেছে, সেই প্রশ্নটিই এখন সবার মনে।


