অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে বিভিন্ন কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একমত হয়েছে তুরস্ক।
শুক্রবার ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চ কৌশলগত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা-আঙ্কারা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতেই হাকান ফিদানের এই সফর। তার সফর দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার এবং দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায়, কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার অঙ্গীকার তুলে ধরে।’
খলিলুর রহমানের সঙ্গে একমত হয়ে হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এটি আরও দৃঢ় করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
দুই মন্ত্রীর বৈঠকে ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় সহযোগিতা’ বিষয়ে তুরস্কের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকও সই করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুই মন্ত্রীর বৈঠকে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আলোচনার মূল বিষয় ছিল। উভয় দেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বিস্তারের সম্ভাবনা আলোচনা করেছে।
তুরস্ক বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমান ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে শিগগিরই দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বলে জানান হাকান ফিদান। বলেন, ‘আমরা আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাব্য উদ্যোগগুলো যাচাই করছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব। আমরা এ সব বিষয়ে আমাদের সহকর্মীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।’
দুই দেশ এরইমধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছে।
বৈঠকে বিশেষ বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, তুর্কি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তুর্কি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিবেদিত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশেষ বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছি। আমরা জানিয়েছি, বাংলাদেশের পোশাক, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জাহাজ নির্মাণ, ফার্মাসিউটিক্যালস, অবকাঠামো উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য শক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, স্মার্ট প্রযুক্তি এবং বেসামরিক বিমান চলাচল তুরস্কের বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় খাত।’
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা সমসাময়িক বিষয়েও দুই মন্ত্রীর আলোচনা হয়।

সম্প্রতি খালিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, এর মধ্য দিয়ে ঢাকা ও আঙ্কারার মধ্যে সহযোগিতার নতুন পথ খুলেছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রার্থিতা সমর্থনের জন্য তুরস্কর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
হাকান ফিদান বলেন, ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা আমাদের কূটনীতির কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার। বর্তমান সময়ের আঞ্চলিক সংঘাতগুলো বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। ইরানের যুদ্ধ সমগ্র বিশ্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনার অগ্রগতি স্বাগত জানাই।’
সেইসঙ্গে তুরস্ক রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। হাকান ফিদান বলেন, ‘রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংকট এখনও চলমান। বাংলাদেশের প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ বছর ধরে আশ্রয় দেওয়ার এই ঐতিহাসিক ত্যাগ মানবজাতির প্রতি একটি দৃষ্টান্ত।’
‘আমরা প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী ও ন্যায্য সমাধান খুঁজতে তীব্র প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এজেন্ডায় রাখার জন্য কঠোরভাবে কাজ করছি’, যোগ করেন তিনি।


