বগুড়ায় এলজিইডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মানহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে আইনি বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ঘটনায় আদালত ও থানায় জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট অমিল রয়েছে।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির মানহানির জন্য তৃতীয় পক্ষের মামলা করার আইনি অধিকার নেই। কিন্তু বগুড়ার আদালত তৃতীয় পক্ষের অভিযোগ গ্রহণ করে থানাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে থানায় জমা দেওয়া এজাহারে নতুন গুরুতর অভিযোগ যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন আসামির নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, আদালত কোনো অভিযোগকে সরাসরি এজাহার (এফআইআর) হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার পর থানায় গিয়ে সেই অভিযোগে নতুন তথ্য যোগ করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে এই প্রক্রিয়াকে নজিরবিহীন হিসেবে অভিহিত করেন।
প্রতিমন্ত্রীর মানহানীতে ক্ষুব্দ আরেকজন
এ মামলার বাদী মো. তানভীর আলম বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ, একটি ইংরেজি দৈনিকের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি এবং স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক। রাজনৈতিকভাবে তিনি এককালে বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মূলত প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামে বগুড়ার নতুন দুটি ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে সমালোচনা এবং প্রতিমন্ত্রীর ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরকারি কাজ পাওয়ার ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পরই এই মামলার সূত্রপাত হয়। মামলা দায়েরের পর পুলিশের অতি-তৎপরতায় মাত্র দুই দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার প্রধান আসামি ও ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলামকে গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ উপেক্ষা
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিমন্ত্রীর মানহানির ঘটনায় তৃতীয় পক্ষের মামলা করার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৮ ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, কেবল যার সুনাম সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তিনিই মানহানির মামলা করতে পারেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টেরও ২০১৬ সালের ‘সুব্রামানিয়ান স্বামী বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ এবং ১৯৭২ সালের ‘জি. নরসিমহান বনাম টি.ভি. চোক্কাপ্পা’ মামলায় একই ধরনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
তবে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি ইকবাল বাহার ‘টাইমসে’র কাছে দাবি করেন, আদালত থেকে তদন্তের নির্দেশ আসলে বা মামলা আমলযোগ্য হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই অনেক সময় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ছাড়াও অন্য কারও দায়ের করা এমন মামলা আদালত গ্রহণ করে থাকে।
আদালত ও থানায় অভিযোগের অমিল
আদালতে গত ১৫ জুন দায়ের করা মূল মামলায় ৪ সংবাদকর্মীর বিরুদ্ধে ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও জালিয়াতির মিথ্যা তথ্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেখানে ‘দুর্নীতির বিতর্কে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম’ এবং কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সামনে প্রতিমন্ত্রীর দৌড়ানোর খবরের মতো কিছু প্রতিবেদনের শিরোনাম উল্লেখ করে বাদীর মনে ‘মারাত্মক আঘাত’ হানার দাবি করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
তবে ১৭ জুন থানায় যে চূড়ান্ত এজাহার জমা পড়ে, তাতে আগের বিবরণের সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুনভাবে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ যোগ করা হয়। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া রেজানুর ইসলামসহ নতুন দুইজনকে আসামি করা হয়।
অতিরিক্ত এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাদী তানভীর আলম জানান, তিনি আইনজীবীর পরামর্শেই এটি করেছেন। অন্যদিকে বগুড়া থানার ওসি ইব্রাহীম আলী টাইমসকে জানান, চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার কারণেই তারা মামলাটি নথিভুক্ত করেছেন।
প্রতিমন্ত্রীর মানহানির ঘটনায় নিজের মামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তানভীর আলম প্রথমে বগুড়ার আঞ্চলিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন। তার দাবি, এত সমালোচনা হলে প্রতিমন্ত্রী অভিমান করে বগুড়ায় উন্নয়ন কাজ বন্ধ করে দিতে পারেন।
অবশ্য প্রতিমন্ত্রীর মানহানীতেিআরেকজন মামলা করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সুর বদলে ফেলেন বাদী তানভীর। এ সময় তিনি বলেন, আসামি তার কাছে ২০ লাখ টাকা চেয়েছে, হুমকিও দিয়েছে। তাই তিনি মামলা করেছেন।
তবে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মো. আতিকুর রহমান ‘টাইমস’কে জানান, এ মামলার বিষয়ে বাদীর সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হয়নি। বাদীর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর সম্পর্ক আর দশজন সাধারণ সাংবাদিকের মতোই।
স্থানীয় সংবাদকর্মী নাজমুল হুদা নাসিমের মতে, প্রতিমন্ত্রীর নিজস্ব প্রেস উইং বা দলীয় নেতাকর্মী থাকা সত্ত্বেও তানভীর আলম মূলত প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই এ মামলার দায়িত্ব নিয়েছেন।
অতি তৎপর পুলিশ
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও দ্রুত গ্রেপ্তার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সাইফ ‘টাইমস’কে বলেন, মানহানির মামলায় সরাসরি গ্রেপ্তারের বিধান নেই। সাধারণত প্রথমে সমন জারি করা হয়।
ডিবি পুলিশ অবশ্য অতি-তৎপরতার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ও নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতাউর রহমানও মামলা গ্রহণ ও আসামি গ্রেপ্তারে কোনো রাজনৈতিক চাপের কথা অস্বীকার করেন।
এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই মামলার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তিনি আসামির জামিন প্রত্যাশা করেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বাদী ও বিবাদীর মধ্যে পর্দার আড়ালে সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে, যার কারণে রোববার আদালতে শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বাদী তানভীর আলম বলেছেন, তিনি সমঝোতার কোনো খবর জানেন না।
সম্পাদক পরিষদের নিন্দা
এদিকে বগুড়ায় সাংবাদিক গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছে সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’। সংগঠনের সভাপতি নুরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ যৌথ বিবৃতিতে বলেন, এ ঘটনা বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার এবং রাষ্ট্র সংস্কারবিষয়ক ৩১ দফার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের হয়রানি ও গ্রেপ্তার করা হতো, বর্তমান ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই উদ্বেগজনক ধারারই পুনরাবৃত্তি ঘটল।
এই ধরনের প্রবণতা দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচককে আরও নিচে নামিয়ে দেবে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে বলে বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।


