পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে পেপার প্যাকেজিং শিল্প নতুন দ্বার উম্মোচন করছে বলে মনে করে এ খাতের উদ্যোক্তারা।
এরই মধ্যে সরকার পেপার প্যাকেজিং পণ্যকে ২০২৬ সালের ‘বর্ষ পণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা বাংলাদেশের শিল্পখাতে একটি সময়োপযোগী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন তারা।
এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) তথ্যমতে, সারাদেশে সচল রয়েছে ১৪০০ পেপার প্যাকেজিং কারখানা।
এসব কারখানা প্রতিবছর ৮ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজিং পণ্য দেশের ভেতরে সরবরাহ করে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে। মূলত ভারত, পাকিস্তান, মরক্কো, তিউনেশিয়া, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোয় রপ্তানি হয় বাংলাদেশি প্যাকেজিং পণ্য।
বিজিএপিএমইএ’র সভাপতি মো. শাহরিয়ার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, পেপার প্যাকেজিং শিল্প দেশের অন্যতম একটি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প। এ খাত দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করে প্রতিবছর ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। অথচ এ খাত সরকারের কোনো প্রনোদনা পায় না।
রপ্তানিতে সরকারি প্রনোদনা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত পোশাক শিল্পের মতো একটি রপ্তানি খাত হিসেবে রূপান্তরিত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংগঠনটির নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পেপার প্যাকেজিংয়ের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ।
সঠিক নীতি সহায়তার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে জানিয়ে মো. শাহরিয়ার বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতে পূর্ণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে আশা করছি খুব দ্রুত প্যাকেজিং খাত দেশের গুরুত্বপূর্ন একটি খাত হয়ে উঠবে।’
সরকার এই ঘোষণা দিলে কাগজ ও কাগজভিত্তিক পণ্যের বাজারে নতুন গতি আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের সঙ্গে পেপার প্যাকেজিং খাতও ধীরে ধীরে একটি অপরিহার্য সহায়ক শিল্পে পরিণত হয়েছে। পোশাক রপ্তানির জন্য ব্যবহৃত কার্টন ও প্যাকেজিং সামগ্রীর বড় একটি অংশ এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।
বিজিএপিএমইএ এর প্রথম সহ–সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ চেীধুরি বলেন, একসময় প্যাকেজিং পণ্য প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। এখন দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমের মাধ্যমে নিজেরাই চাহিদা পূরণ করছেন।
‘বর্ষ পণ্য ঘোষণার ফলে এই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়বে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই চাহিদা বাংলাদেশের পেপার প্যাকেজিং শিল্পের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।’
বিশ্ববাজারে প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং শিল্পের আকার প্রায় ১ হাজার ৫৪৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাজারের মাত্র ১ শতাংশ ধরতে পারলেও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের পেপার প্যাকেজিং রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনো তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। পেপার প্যাকেজিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় খাত এগিয়ে এলে রপ্তানি ঝুঁকি কমবে এবং অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসবে বলে মনে করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বর্ষ পণ্য’ ঘোষণার প্রভাব হিসেবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, রিসাইক্লিং প্রযুক্তি ও কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবে। পাশাপাশি দক্ষ ও আধা–দক্ষ শ্রমিকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অনেকদিন ধরেই প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পেপার প্যাকেজিং বৈশ্বিকভাবে দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। কার্বন নিঃসরণ কমানো ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির আন্তর্জাতিক চাপের কারণে বাংলাদেশের এই খাত বিদেশি ক্রেতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ টাইমসকে বলেন, ‘সরকার যদি এ খাতে কর ছাড় ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে পেপার প্যাকেজিং খাত টেকসই শিল্পায়নের একটি মডেল হতে পারে।’


