দেশের বৃহত্তম তিস্তা সেচ প্রকল্প এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহারের ফলে প্রমত্তা তিস্তা আজ মৃতপ্রায় এক নালায় পরিণত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে উত্তরের কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায়।
নদী শুকিয়ে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক জমিতেও পানি সরবরাহ করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড। ফলে বিকল্প উপায়ে সেচ দিতে গিয়ে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের লাখো কৃষক।
একসময় যে নদীর গর্জনে দুই কূল কম্পিত হতো, সেখানে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর আর মরুভূমির হাহাকার। নীলফামারীর ডালিয়ায় অবস্থিত এই বিশাল সেচ অবকাঠামো ঘিরে গত তিন দশকে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও পানির অভাবে তা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে যেখানে পানির প্রবাহ ২ লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়, শুষ্ক মৌসুমে তা ভয়াবহভাবে কমে মাত্র ২ হাজার কিউসেকে নেমে আসে। ডালিয়া পয়েন্টে কখনো কখনো এই প্রবাহ ৫০০ কিউসেকের নিচেও নামছে বলে জানা গেছে।
তিস্তা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ অংশে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিস্তা ব্যারাজ থেকে শুরু হওয়া ৭৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খালগুলো নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এই খালগুলোর সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ চলছে, যার ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন নতুন স্লুইসগেট ও পাকা ক্যানেল তৈরি করা হলেও উৎস নদীতে পানি না থাকায় এসব সেচনালা কৃষকের কোনো কাজে আসছে না। অনেক এলাকায় নির্মিত আধুনিক অবকাঠামোতে আজ পর্যন্ত একবারও তিস্তার পানি পৌঁছাতে পারেনি।
পানির এই চরম সংকটের মধ্যেও সরকারি তথ্যে বড় ধরনের বিভ্রান্তি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান দাবি করেছেন যে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন এবং বর্তমানে পর্যাপ্ত পানি রয়েছে।
তবে তার এই বক্তব্যের ঠিক উল্টো চিত্র তুলে ধরেছেন ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী। তিনি জানান, ব্যারাজের উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে ভাটির ১১০ কিলোমিটার এলাকায় সামান্য পানি সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের এমন তথ্যের লুকোচুরি পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আড়াল করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
১৯৯০ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া। কিন্তু তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য অধরাই রয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৫৭ হাজার হেক্টর ধরা হলেও মাঠের চিত্র বলছে, পানির অভাবে এর অর্ধেকও অর্জন করা সম্ভব হবে না।
নীলফামারীর ইটাখোলা এলাকার কৃষক জগদীশ চন্দ্র আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, নদীর পানি পেলে চাষাবাদে বিঘাপ্রতি খরচ হতো মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অথচ এখন শ্যালো মেশিনে ডিজেল পুড়িয়ে পানি দিতে গিয়ে খরচ হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সার ও তেলের বাড়তি দামের ওপর পানির এই অতিরিক্ত খরচ মেটাতে গিয়ে কৃষকেরা এখন ঋণের জালে জর্জরিত।
এই সংকট নিরসনে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নকে যথেষ্ট মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সদস্য সোহেল হাসান জানান, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, শুধু ক্যানেল খনন করে লাভ নেই। বরং বর্ষা মৌসুমের উপচে পড়া পানি ধরে রাখার জন্য বড় ধরনের জলাধার বা ‘রিজার্ভার’ তৈরি করতে হবে। তা নাহলে সরকারের এই হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত বালুচরেই ঢাকা পড়ে থাকবে। চিরতরে মুখ থুবড়ে পড়বে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা।


