দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে তার প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের বৈঠকে সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এই তথ্য জানান।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা।
এ অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, রফতানি ও রেমিট্যান্স আয়ের ২০ শতাংশ, জাতীয় সঞ্চয়ের প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নিট বৈদেশিক সহায়তা ও এফডিআই প্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ।
বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যার সুপারিশ অনুযায়ী মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইস চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই কেসগুলোর মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচবিএম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এসব মামলা অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দার সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে।
জেআইটি গঠনের পর মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭৬ হাজার ৮ শত ১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) প্রেরণ করা হয়েছে এবং পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪২টি মামলা রুজু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি মামলার চার্জশিট দাখিল এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।
পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বিএফআইইউ এর অধীনে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন গঠন করা হয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনুসরণে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএসিসিসি, স্টার, বিশ্বব্যাংক, ইউএনওডিসি, আইসিএআর ও ইউএসডিওজে থেকে পরামর্শ, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে গ্লোবই নেটওয়ার্ক এবং এরিন-এপি এর সদস্যপদ অর্জন করেছে। ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমেও পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংক তাদের ঋণের অর্থ উদ্ধারের জন্য নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরপূর্বক ৯টি আন্তর্জাতিক আইনী প্রতিষ্ঠানকে ‘নো উইন, নো ফি’ শর্তে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
প্রথম পর্যায়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা এবং ওরিয়ন গ্রুপ—এই ৬টি কেইস নিয়ে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ব্যাংক কর্তৃক অর্থ পুনরুদ্ধারের এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে ১৯ কোটির ওপরে ব্যাংক হিসাব
একই অধিবেশনে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের ব্যাংকিং খাতের এক বিশাল মাইলফলকের তথ্য তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে সর্বমোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি, যার মধ্যে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী হিসাবের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি।
এ ছাড়া দেশের ব্যাংকগুলোতে বর্তমান মোট ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। বর্তমানে বাংলাদেশে সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ প্রণয়ন করে কাজ করছে।
চলমান প্রথম কৌশলের মেয়াদ জুন ২০২৬ সালে শেষ হতে চলায়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার শতভাগে উন্নীতকরণের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এখন এর দ্বিতীয় পর্যায় অর্থাৎ ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল ২’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
নতুন এই মহাপরিকল্পনাটি জুন ২০২৬ থেকে শুরু হয়ে জুলাই ২০৩১ সময়কালের মধ্যে দেশজুড়ে বাস্তবায়ন করা হবে, যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিককে কোনো না কোনো বৈধ আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সমীক্ষায় সাড়ে ৪ কোটি বরাদ্দ
এদিকে, সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকার অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত একটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প।
বর্তমানে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণে সেতু বিভাগের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ রাখা না হলেও প্রকল্প নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিজস্ব অর্থায়নে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় ‘পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ২য় পদ্মা সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্তকরণের সুপারিশ করা হয়েছে।


