বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরী সিঙ্গাপুরে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। আর এই ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যবহার করেছেন ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত একাধিক শেল কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করা অর্থ।
অনুসন্ধানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যেও তার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশ। এসব সম্পদও পাচারের অর্থেই কেনা।
টাইমসের অনুসন্ধানে সিঙ্গাপুর ল্যান্ড অথরিটি (এসএলএ) থেকে পাওয়া নথিতে দেখা গেছে, এস এন করপোরেশনের চেয়ারম্যান শওকত ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭৯ দশমিক ৩ কোটি টাকায় ওশান ড্রাইভের বিলাসবহুল ভবন ‘দ্য কোস্ট অ্যাট সেন্তোসা কোভ’-এর দুটি কন্ডোমিনিয়াম বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন।
২০২৩ সালের ২ মে এই ফ্ল্যাট কেনার সময় নিজের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন শওকত। ঠিক এর আগের মাসেই ভুতুড়ে জাহাজ আমদানির নামে অন্য আরেকটি দেশ ঘুরে সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার করেছেন তিনি।
দুটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় একই। একটি ২ হাজার ৩৩৬ বর্গফুট এবং অন্যটি ২ হাজার ৩৫৭ বর্গফুট আয়তনের। প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম ৩ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার বলে এসএলএ’র নথিতে উল্লেখ আছে। এর মধ্যে প্রথম ফ্ল্যাটটি শুধুমাত্র শওকতের নামে, আর দ্বিতীয়টি যৌথভাবে তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারিন ও শাশুড়ি নাদেরা বানু বেগমের নামে নিবন্ধিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই সম্পদ কেনার জন্য কোনো অনুমোদিত চ্যানেল দিয়ে এক পয়সাও বিদেশে পাঠানো হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, কেবল ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশে বিনিয়োগ করা যায়। বর্তমানে দেশের মাত্র ২৩টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদন আছে, যেগুলোর সঙ্গে শওকতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডাটাবেসে শওকত আলীর নামে বিদেশে কোনো বিনিয়োগ বা সম্পত্তি কেনার তথ্য নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বৈধ চ্যানেলে বিদেশে সম্পদ কেনার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ‘যেসব রপ্তানিকারক কোম্পানির এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটায় (ইআরকিউ) পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা আছে, তারা কেবল ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে।’
যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্ম পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাত যৌথভাবে সিডিনেট কমিউনিকেশনস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির মালিক। প্রতিষ্ঠানটি সামিট কমিউনিকেশনস ও মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের সঙ্গে কনসোর্টিয়াম গঠন করে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর সাবমেরিন কেবল সংযোগ প্রকল্পে অংশ নিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের সরকারি নথি বলছে, এই কনসোর্টিয়াম সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্যাম্পানা গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, এ প্রকল্পের জন্যও শওকতকে বিদেশে অর্থ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে স্পষ্টতই, সিঙ্গাপুরের ফ্ল্যাটগুলো কেনা হয়েছে পাচার করা অর্থে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন শওকতের বিদেশি সম্পদের তদন্ত করছে। সেই তদন্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের পাম জুমেইরা বিচে ২ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারের একটি সম্পদের খোঁজ পেয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া দেশটির লানাই আইল্যান্ডের তিলাল আল ঘাফ কমিউনিটিতে ২৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল ভিলার বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।
তিন সদস্যের এই তদন্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দুদকের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। তার সঙ্গে কাজ করছেন সহকারী পরিচালক আজগর হোসেন ও মো. ইব্রাহিম খলিল।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আগেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, শওকতের যুক্তরাজ্যেও সম্পদ থাকতে পারে। যদিও প্রাথমিক অনুসন্ধানটি পরে বন্ধ হয়ে যায়। টাইমসের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক শেল কোম্পানির মাধ্যমে কয়েক স্তরের জটিল লেনদেনের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে অর্থ স্থানান্তর করেছেন শওকত।
বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ অনুযায়ী, বিদেশে অর্থ পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। এতে চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাচার করা অর্থের দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে।
বিএফআইইউ’র একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘শওকতের অর্থ পাচার প্রমাণিত হলে শুধু জেল বা জরিমানা নয়, সরকার চাইলে বিদেশে কেনা সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগও নিতে পারবে।’
বাংলাদেশের শিপ ব্রেকিং খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী শওকত বর্তমানে ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে আছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তিনি ওই পদে থাকতে পারবেন না।
শওকত আলী চৌধুরীর বক্তব্য জানার জন্য গত ১৫ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত তার সঙ্গে টেলিফোন ও মেসেজের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে টাইমস। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার মন্তব্য ছাড়াই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়েছে টাইমস অব বাংলাদেশকে।


