ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর অস্থির হয়ে উঠেছে সেখানকার রাজনীতি। পরাজয়ের পরেও পদত্যাগ না করার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যা ভারতের রাজনীতিতে প্রথম। বরং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে ‘ভোট লুটে’র অভিযোগ তুলেছেন মমতা। অন্যদিকে বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে পরাজিতদের ওপর বিজয়ীদের হামলা-অফিস দখল। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে তীব্র সংঘাতের পরিবেশ।
ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভোট গণনাকেন্দ্রের ভেতরে একজন মুখ্যমন্ত্রীর পেটে লাথি মারার মতো অভিযোগও করেছেনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে নাকচ করে দিয়েছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা।
একদিকে যখন নতুন রাজ্য সরকারের শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিজয়ী বিজেপি, সেই সময় মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেছেন পরাজিত তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সংবাদ সম্মেলনেই বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন তিনি। মমতার দাবি, ভবানীপুর কেন্দ্রের সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে ও পেটে লাথি মারা হয়েছে। আর এই পুরো ঘটনাটি ঘটাতে সাহায্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা।
এর জবাবে কলকাতা দক্ষিণের জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা রণধীর কুমার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী ধাক্কা দেওয়া বা পেটে লাথি মারার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। গণনা প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছ, সিসিটিভি ক্যামেরাও কখনো বন্ধ করা হয়নি।
ফলাফল পরবর্তী এই অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় চমক ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত। সাধারণত পরাজয়ের নৈতিক দায় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীরা রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি দাবি করেছেন, তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে হারেনি। বরং বিজেপির পক্ষ থেকে একশরও বেশি আসন পরিকল্পিতভাবে লুট করা হয়েছে।
তার অভিযোগের তীর সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দিকে। তিনি নির্বাচন কমিশনকে এই প্রক্রিয়ার ‘ভিলেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দাবি করেছেন, বিজেপি ও কমিশনের মধ্যে একপ্রকার গোপন সমঝোতা বা ‘বেটিং’ হয়েছে। গণনাকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে বিজেপির পক্ষে হাওয়া তোলার যে অভিযোগ তিনি এনেছেন, তা জনমানসে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচনে জয়ের পর বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘোষণা ছিল কোনো বদলা নেওয়া হবে না। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের ওপর বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা হামলা চালিয়েছে। অনেক জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেসের অফিস দখল করে নিয়েছে বিজেপির কর্মীরা। বেশ কয়েকটি এলাকার কলেজে তৃণমূল সমর্থক ছাত্র সংগঠনের কক্ষ দখল হয়েছে, তৃণমূলের অঙ্গ শ্রমিক সংগঠনের অফিসও দখল হয়েছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে ১৯৭২ সালের সন্ত্রাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছেন, অতীতে তৃণমূল জেতার পর ‘বদলা নয় বদল চাই’ স্লোগান দিয়ে যে সংযম দেখিয়েছিল, বিজেপি তা পদদলিত করছে। এসব সহিংসতা ঘটনা তদন্ত করতে তার দল ১০ সদস্যের একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটিও তৈরি করেছে।
অবশ্য দিনশেষে পরাজয়ও হজম করে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়েছেন, এখন তার চেয়ার নেই, তাই তিনি ‘মুক্ত বিহঙ্গ’। নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রাস্তার লড়াইয়ে ফিরে যাওয়ারও অঙ্গীকার করেছেন।
একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতে অখিলেশ যাদব বা রাহুল গান্ধীর মতো বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতাদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে জাতীয় স্তরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করতে চাইছেন তিনি।
পরাজয়ের পর মমতা বন্দোপাধ্যায়ের মধ্যে এমন অস্থিরতা দেখা গেলেও বিপরীত চিত্র বিজেপি শিবিরে। এই দলের প্রধান নেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগে উগ্র কথাবার্তা বললেও ফলাফলের পর বেশ শান্ত। বরং সবাইকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। নির্বাচনের আগে মুসলিশ ও বাংলাদেশ-বিরোধী কথাবার্তায় সোচ্চার থাকলেও জয়ের পর মুসলমানদের নিয়ে তার কোনো কথা নেই। নেই বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কথা।
বিজেপি এখনো মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে সবাই মোটামুটি নিশ্চিত, মমতা বন্দোপাধ্যায়কে তারই নিজের আসনে হারানো শুভেন্দু অধিকারীই হচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি শাসন করেছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস। এবার প্রথমবারের মতো ক্ষমতার দখল নিল কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি।
ঐতিহাসিক এ বিজয়কে ভিন্নভাবে উদযাপন করারও পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গভর্নরের বাসভবন রাজভবনে গিয়ে শপথ নিতেন। এবার কলকাতায় জনসভার জন্য বিখ্যাত মাঠ ব্রিগেডে হবে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। এর মাধ্যমেই পুরো ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জয়কে গর্বের ‘ট্রফি’ হিসেবে দেখাতে চাইছে বিজেপি।


