বাংলা সাহিত্যে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এক অনিবার্য নাম। ১৯৩৬ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে উপন্যাসটি লেখেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনও তিনি মার্কসবাদে দীক্ষিত নন। ফলে এই উপন্যাসে শ্রমজীবী মানুষের জীবনচিত্র যতটা বাস্তব ও সংবেদনশীল, ততটাই অনির্ণীত তার শ্রেণিগত অবস্থান।
পরবর্তীকালে মানিক নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ফিরে তাকালে তার আগের অনেক লেখাতেই বিভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ তার বড় উদাহরণ।
উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু পদ্মার তীরবর্তী জেলে-মাঝিদের জীবন। কুবের, গনেশ, ধনঞ্জয়; এরা সমাজের সর্বহারা প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। জমিদার, আড়তদার, নায়েব, মহাজন; এরা সবাই কোনো না কোনোভাবে তাদের শ্রম শোষণ করে। কিন্তু এই দারিদ্র্যের মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না।
জীবনে প্রেম আসে, উৎসব আসে, ঈর্ষা আর সহমর্মিতাও আসে। উপন্যাসে মেলে ধর্মীয় বিভাজন ছাপিয়ে শ্রেণিগত সহাবস্থানের ইঙ্গিতও। আর এই জায়গাতেই মানিকের শক্তি। বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে এমন আঙ্গিকে ধরতে পেরেছিলেন।
তবে উপন্যাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও দুর্বল অংশ হোসেন মিঞা ও তার ময়নাদ্বীপ।
বাস্তবতার ভেতর হঠাৎ যেন এক ধরনের ইউটোপিয়া ঢুকে পড়ে। হোসেন মিঞা বিত্তশালী, আফিম ব্যবসায়ী, কিন্তু মাঝিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক রহস্যময়ভাবে মানবিক। সে বিনা সুদে ঋণ দেয়, সাহায্য করে, ময়নাদ্বীপে বসতি গড়তে চায়; কিন্তু কেন? এর পেছনে কোনো স্পষ্ট শ্রেণীস্বার্থ মানিক দেখাতে পারেননি। ফলে উপন্যাস ধীরে ধীরে শ্রেণীসংগ্রামের জায়গা থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিতে আটকে পড়ে। রাসু, আমিনুদ্দিন বা কুবের—তারা হয়ে ওঠে পরিস্থিতির অসহায় শিকার, সচেতন সংগ্রামী নয়।
১৯৫০–৬০-এর দশকে মানিক নিজেই এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করেছিলেন। কিন্তু তার আগের লেখা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ রয়ে যায় এক ধরনের দ্বিধাগ্রস্ত দলিল হিসেবে। যেখানে শ্রমজীবী জীবন আছে, কিন্তু তার কাঠামোগত কারণ উন্মোচিত নয়।
এই উপন্যাসই ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্রে রূপ দেন পশ্চিমবঙ্গের নির্মাতা গৌতম ঘোষ। ভারত–বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ছবিটি মুক্তির পর দুই দেশেই প্রশংসা পায়, জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—৫৬ বছর পর নির্মিত এই চলচ্চিত্র কি উপন্যাসের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পেরেছে?
গৌতম ঘোষের ছবিতে প্রকৃতি প্রবলভাবে উপস্থিত। পদ্মা নদী যেন প্রায় একটি চরিত্র। ক্যামেরা বারবার নদীর বিশালতা, নীরবতা, ভয়াবহতার দিকে ফিরে যায়। এতে দৃশ্যমান সৌন্দর্য তৈরি হয়, কিন্তু অনেক সময় মানুষ আড়ালে পড়ে যায়। মানিক যেখানে মাঝিকে কেন্দ্রে রেখেছিলেন, গৌতম সেখানে নদীকে সামনে আনেন।
হোসেন মিঞার চরিত্রেও এই পার্থক্য স্পষ্ট। উপন্যাসে কুবেরের মনে হোসেন মিঞাকে নিয়ে সন্দেহ, ভয় ও ঘৃণা আছে। চলচ্চিত্রে তা প্রায় অনুপস্থিত। বরং গৌতম ঘোষ নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘হোসেন মিঞারাই সমাজকে স্বপ্ন দেখায়।’
এই ব্যাখ্যা মানিকের উপন্যাসে স্পষ্ট নয়, বরং তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে ছবিতে হোসেন মিঞা এক ধরনের মানবিক স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে ওঠেন, যা আদতে বুর্জোয়া রোমান্টিসাইজেশন।
তবে চলচ্চিত্র হিসেবে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র শিল্পমান অস্বীকার করা যায় না। রাইসুল ইসলাম আসাদের কুবের সংযত, ভেতরে জমে থাকা যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। চিত্রনায়িকা চম্পা অভিনয় করেছিলেন মালা চরিত্রে। সেখানে নিজের তারকাখ্যাতি ভেঙে অভিনয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেন। রূপা গাঙ্গুলীর কপিলা চরিত্রটি সংবেদনশীল ও সাহসী।
ক্যামেরার কাজ, লোকেশন, পোশাক পরিকল্পনা; সব মিলিয়ে ছবিটি ঢাকার মূলধারার চলচ্চিত্রের তুলনায় অনেক উঁচু মানের।
তবে দুর্বলতাও আছে। অতিরিক্ত অন্ধকার বা আলোর স্বল্পতা, অস্পষ্ট শব্দ, খাপছাড়া বর্ণনা—সব মিলিয়ে সাধারণ দর্শকের জন্য ছবিটি সহজ হয়ে ওঠেনি। সম্ভবত এ কারণেই এটি মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাস ও চলচ্চিত্র—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ভিন্ন কারণে। উপন্যাসটি শ্রমজীবী জীবনের এক অনন্য দলিল, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। আর চলচ্চিত্রটি শিল্পগুণে সমৃদ্ধ হলেও আদর্শগতভাবে আরও এক ধাপ পেছনে। এই দ্বন্দ্বই ‘পদ্মা নদীর মাঝি’কে আজও আলোচনার কেন্দ্রে রাখে।


