উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে কৃষিতে সূচিত হয়েছে এক নতুন দিগন্ত। একই জমিতে একসাথে আলু ও ভুট্টা চাষ করে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। সনাতনী প্রথা ভেঙে জমির বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, অন্যদিকে অভাবনীয়ভাবে বাড়ছে কৃষকের আয়।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) রাইস ফার্মিং সিস্টেমস বিভাগের তত্ত্বাবধানে পঞ্চগড় সদর উপজেলার মৌলভিপাড়া এলাকায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এই চার ফসল চাষচক্রের পরীক্ষা। এর ফলে যে জমিতে আগে বছরে মাত্র দুটি ফসল ফলতো, সেখানে এখন অনায়াসেই উৎপাদিত হচ্ছে চারটি ফসল।
এই নতুন পদ্ধতিতে আলু ও ভুট্টা সংগ্রহের পর একই জমিতে পাট, মিষ্টি কুমড়া ও শাক চাষ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে চাষ হচ্ছে আমন ধান। এলএসটিডি প্রকল্পের অধীনে একজন চাষি তার এক একর জমিতে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে প্রথমবারেই পেয়েছেন আশাতীত ফলন। নতুন এই কৃষি পদ্ধতির সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও এখন এই পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মূলত জোড়া সারি পদ্ধতিতে একই সময়ে আলু ও ভুট্টার বীজ রোপণ করায় সারের অপচয় কম হয়, শ্রমিকের খরচও সাশ্রয় হচ্ছে।
মৌলভিপাড়া এলাকার কৃষক সারোয়ার হোসেন তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আগে তারা বছরের পর বছর জমিতে কেবল ভুট্টার পর আমন ধান চাষ করে আসছিলেন। তবে ব্রি’র রাইস ফার্মিং সিস্টেমস বিভাগের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, একই জমি থেকে বছরে চারটি ফসল পাওয়া সম্ভব।
সারোয়ার হোসেন এবার জোড়া সারি পদ্ধতিতে আলু ও ভুট্টা চাষ করেছেন। বর্তমানে তার এক একর জমি থেকে আলু উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান, সাধারণ জমির তুলনায় এই পদ্ধতিতে আলুর আকার ও মান অনেক ভালো হয়েছে এবং ভুট্টা গাছগুলোও বেশ সতেজ ও সবল হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতি কৃষকদের গতানুগতিক চাষাবাদের ধারণা পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাইস ফার্মিং বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন পায়েল জানান, জোড়া সারি পদ্ধতিতে আলু ও ভুট্টা চাষের মাধ্যমে একই জমিতে বছরে চার ফসল উৎপাদনের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং তাদের আর্থিকভাবে আরও লাভবান করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। কৃষি বিজ্ঞানের এই আধুনিক প্রয়োগ পঞ্চগড়ের কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, একই সাথে আলু ও ভুট্টা চাষের এই অভিনব পদ্ধতি পঞ্চগড়ের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জমির সুষম ও বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাড়তি ফসল উৎপাদনের এই সুযোগ প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
আধুনিক এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকরা আরও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন বলে মনে করেন আব্দুল মতিন।


