রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবারে অগ্নিসংযোগের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার সকালে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফ আল রাজীব জানান, গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন- গোয়ালন্দ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিরু মৃধা, উজানচর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মাসুদ মৃধা, শাফিন সরদার, এনামুল হক জনি ও কাজী অপু।
ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার জনকে। হামলার রাতেই শুক্রবার থানার উপ-পরিদর্শক সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় মামলাটি করেন।
গত শুক্রবার দুপুরে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। এসময় পুলিশ নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে এলে পুলিশের ওপর হামলা করে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
এদিকে, নুরাল পাগলার দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও তার মরদেহ কবর থেকে তুলে পোড়ানোর ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং। হামলার রাতে এক বিবৃতিতে প্রেস উইং বলেছে, এ ধরনের ‘ঘৃণ্য বর্বরতা’ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন নুরাল পাগলার দরবারে হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। শনিবার এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন ও পোড়ানোর ঘটনা ‘অজ্ঞতাজনিত বর্বরতা’। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে ইসলাম, ইসলামী রাজনীতি কিংবা ইসলামী চিন্তার কোনো সম্পর্ক নেই।’
গোয়ালন্দের স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলা বহু বছর আগে নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন দরবার শরীফ। আশির দশকের শেষের দিকে নিজেকে ‘ইমাম মাহদী’ দাবি করে আলোচনায় আসেন তিনি।
ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ জনরোষ এড়াতে তিনি মুচলেকা দিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি আবার ফিরে এসে তার দরবার শরীফের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
গত ২৩ আগস্ট ভোরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুরাল পাগলা। পরে ওইদিনই সন্ধ্যায় এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে তার প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তার ভক্তানুরাগীদের অংশগ্রহণের দরবার শরীফের ভেতরে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে রাত ১০ টার দিকে তাকে মাটি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু স্থানে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। পবিত্র কাবা শরীফের আদলে তার কবরের রং করা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ফুঁসে ওঠেন বিক্ষুব্ধ জনতা। তাদের আন্দোলনের ফলে কবরের রং পরিবর্তন করা হয়।
এ বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক হয় বিক্ষুব্ধ জনতা ও নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যদের। এরপরেও কবর নিচে নামাতে গড়িমসি করে নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যরা।
পরে এ বিষয়ে দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। কবর নিচে নামানো না হলে কবর ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার জুম্মার পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভ থেকে হামলা চালানো হয় নুরাল পাগলার দরবারে। পাল্টা আক্রমণ করেন নুরাল পাগলার ভক্তরা। ইট-পাটকেল নিক্ষেপসহ তুমুল সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন। এক পর্যায়ে নুরাল পাগলার দরবারে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।


