আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা মহড়া ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে অপরাধী আটক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অপারেশন ‘ডেভিল হান্ট-২’চলছে। নির্বাচন ভণ্ডুল ও অরাজকতা সৃষ্টির যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
তবে অবৈধ এবং বিগত সময়ে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র নিয়ে ভোটের মাঠে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে। যৌথ বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অবশ্য অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে। সিআইডি থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাহিনীর প্রধানরা নিয়মিত দেশের বিভিন্ন জেলা সফর করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অস্ত্র ঢোকার চেষ্টা করলেও সেসব ধরা হচ্ছে এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেছেন, দেশে প্রথমবারের মতো দেড় লাখ পুলিশ সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ৯ লক্ষাধিক সদস্য
স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, ভোটের আগে চার দিন এবং পরে সাত দিন পর্যন্ত মাঠে থাকবে যৌথ বাহিনী। নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন বাহিনীর ৯ লাখের বেশি সদস্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য থাকবেন এক লক্ষাধিক।
এ ছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজারের বেশি, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন, পুলিশের দেড় লক্ষাধিক, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার, বিজিবির ৩৮ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫০০, র্যাবের প্রায় ৮ হাজার এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
তিন বাহিনী প্রধানদের মন্তব্য
তিন বাহিনীর প্রধানগণও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে তাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘সুন্দর নির্বাচন করার জন্য বাহিনীগুলো সক্ষম। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে চায় সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সব বাহিনী।
নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, দিনরাত অপারেশনের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীদের আটক করা হচ্ছে। দুষ্কৃতকারীরা যেন সর্বদা আতঙ্কে থাকে, সেই পরিবেশ বজায় রাখা হবে।
বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন দায়িত্বরত সদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
বাড়তি নিরাপত্তার ছক
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৯৯টি নির্বাচনী এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ছক সাজানো হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ১৯৯টি অস্ত্র ও এক হাজার ৯৭২ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার এবং এক হাজার ৮০৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
উদ্বেগ-আশঙ্কা
তবে এসব তৎপরতার মধ্যেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ, ঢাকার মোহাম্মদপুরে মাওলানা জসিম উদ্দিন রাহমানির বাসার সামনে বিস্ফোরণ এবং জিয়া উদ্যান থেকে জঙ্গি আটকের ঘটনাগুলো আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া যশোরের বাঘারপাড়ায় যৌথবাহিনীর অভিযানে ১০টি শক্তিশালী গ্রেনেড ও বিদেশি পিস্তলসহ বিপুল অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, যার নেপথ্যে জঙ্গি সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পেয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট। যশোরের শার্শায় বোমা বিস্ফোরণে শ্রমিক আহত হওয়া এবং শরীয়তপুরে জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ইসমত জাহান ওরফে ইলোরা হাওলাদারকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলোকেও ভোটের মাঠের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিলেট সীমান্ত দিয়ে আসছে বিস্ফোরক
সিলেট সীমান্ত দিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক আসার বিষয়টিও নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। র্যাব-৯-এর তথ্যমতে, গত ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ ভারতীয় বিস্ফোরক, ডেটোনেটর, সাউন্ড গ্রেনেড ও পেট্রল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। গত ২ ফেব্রুয়ারি বড়লেখায় বিজিবির অভিযানে ভারতের নাগপুরে প্রস্তুত করা ২৪টি পাওয়ার জেল ও ২৩টি ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পাওয়ার জেল ও ইলেকট্রিক ডেটোনেটরগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এগুলো নাশকতার কাজে ব্যবহৃত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই বিস্ফোরক নিয়ে সিলেট জেলা বিএনপি সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত গণঅভ্যুত্থাণের সময় লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের তাগিদ দিয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম শাহীনও সীমান্ত দিয়ে বিস্ফোরক আসাকে নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তবে পুলিশের সিলেট রেঞ্জের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ারুল হক আশ্বস্ত করেছেন, এসব বিস্ফোরক মূলত পাথরের খনিতে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
কিছু ঘটনা
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, শরীয়তপুরে সেনাবাহিনীর ৫ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযানে সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ইসমত জাহান ইলোরা হাওলাদারের বাড়ি থেকে একে-২২ রাইফেল, পিস্তল ও শর্টগানসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন অভিযানে নড়িয়া ও ডামুড্যা এলাকা থেকেও অস্ত্রসহ রাব্বি মোড়ল নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর ৫ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিঞা মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জানান, নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।


