সরকারের ঘোষিত সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। তারপরও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপার মূল অংশটি।
গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের) এর নেতৃত্বাধীন দলটি আওয়ামী লীগের শাসনামলের মতো নির্বাচন ব্যবস্থা এখনো নিয়ন্ত্রিত বলে মনে করছে। চলমান অবস্থা নির্বাচন হলে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হওয়া নিয়ে শঙ্কা দলটিতে। তাই শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে জাপা থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
পতিত আওয়ামী লীগের শেষ চার টার্মের শাসনামলের শেষদিন পর্যন্ত দলটিকে সহায়তাকারী জাপার সাংগঠনিক অবস্থা এখন বেশ নাজুক অবস্থা। জাপার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খোদ রংপুর তথা উত্তরবঙ্গেও জনপ্রিয়তা কমেছে হতাশাব্যাঞ্জক হারে।
এ অবস্থায় নির্বাচনে বেশিরভাগ আসনে জনপ্রিয় প্রার্থী পাওয়া দলটির জন্যে কঠিন। এ ছাড়া গত বছরের ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ফ্যাসিস্টের সহযোগী হিসেবে চাপে রয়েছে জাপা। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এর বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে মামলাও রয়েছে।
এমন অবস্থায় নানা চ্যালেঞ্জ ও সংশয়ের মধ্যেও জাপা ৩০০ আসনে প্রার্থী দিতে কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেড় শতাধিক আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। অবশিষ্ট আসনে প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করার কাজ চলছে।
নিজ দলের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ‘ক্লিন ইমেজধারী’ বা দলটির পদ পদবিতে ছিলেন না এমন কিছু জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে দলটি ইতিবাচক বলেও জানা যাচ্ছে। তফশিল ঘোষণার পরপরই দলটি প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করবে।
জাপার চেয়ারম্যান জিএম কাদের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সরকার ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনকি তফশিলের হলেও ভোট কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে যেসব রাজনৈতিক দল মাঠে রয়েছে তাদের মধ্যেই নানা বিষয়ে দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রথমত ভোট সুষ্ঠু হতে হবে। পাতানো নির্বাচন করতে চাইলে দেশের বাইরে থেকেও নানামুখী চাপ আসতে পারে। এমনকি নির্বাচনও ভন্ডুল হতে পারে। এ ছাড়া মবতন্ত্রের এই অবস্থায় নির্বাচন যদিও হয় সুষ্ঠু ভোট হবে না। আমরা ভোটে নামলে কখন যে কে হামলা চালায় তার কোন গ্যারান্টি নেই। তারপরও জাপা যেহেতু এখনো ভোট বর্জন করেনি সুতরাং প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করছি।’
প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করতে জাপার মহাসচিবসহ দলটির নেতারা কাজ করছেন। কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফরও করে প্রার্থী ঠিক করছেন। প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে দলটি একটি টিমও গঠন করেছে।
একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখাতে সরকার জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখবে না বলে জাপার কাছে বার্তা রয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ এখন সাময়িক নিষিদ্ধ হয়ে নির্বাচনের বাইরে। ফলে, নতুন করে জাপাকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে সরকার।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি) জামায়াতকে চাপে রাখার কৌশল এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে দলটিকে ভোটের বাইরে রাখার বিপক্ষে।
জাপা নেতারা মনে করছেন, ভোট করতে এখন পর্যন্ত আইনগত বাধা না থাকলেও এনসিপি জামায়াতসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল জাপার ব্যাপারে ইতিবাচক নয়। তাই কৌশলী দলটি প্রার্থীদের এখনই নাম প্রকাশ না করতে চাইছে না। তফসিল ঘোষণার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূলে আসার অপেক্ষায় রয়েছে জাপা। তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে দলটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে চায়।
জাপা এবার প্রার্থী নির্বাচনে বেশ কৌশলী। পতিত আওয়ামী লীগ সাময়িক নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের ভোট ব্যাংক কাজে লাগাতে দলটির জনপ্রিয় ব্যক্তিদেরকে প্রার্থী করার চেষ্টা করছে দলটি। জাপার জনপ্রিয় এবং সিনিয়র নেতাদের আসন ছাড়া অবশিষ্ট জায়গায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের নামও তালিকায় স্থান পাচ্ছে। বিশেষ করে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগকে বিশেষ টার্গেট দলটির।
অনেকেই বলছেন, জাপার চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ইস্যুতে দলটির পক্ষে বেশ সরব ছিলেন। পতিত দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জাপা চেয়ারম্যানের যোগাযোগ রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে দলটির ভোট টানতে চায়। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতের আনুকূল্যতা পেতে চায়। কারণ, প্রতিবেশী দেশ ভারত আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে বাইরে চলে যাক সেটি চায় না। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই গণহত্যায় মামলায় গ্রেফতার না হওয়া এবং জাপা নিষিদ্ধের আন্দোলনে নূরুল হক নুরকে হামলার ঘটনায় মামলা না নেয়ার চেষ্টা দলটির বিশেষ শক্তির প্রমাণ বহন করে। দলটির কোন কোন বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্রের ‘আর্শিবাদ’ ওই শক্তির উৎস বলে অভিযোগ উঠে।
জাপা আওয়ামী লীগের ক্লিন ইমেজধারীদের মনোনয়ন দেবে কিনা প্রশ্নের জবাবে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন টাইমসকে বলেন, ‘যারা গণহত্যায় জড়িত না এমন ভালো প্রার্থী পেলে সে যে দলের হোক আমরা মনোনয়ন দেব।’
এদিকে, জাপার একজন প্রেডিয়াম সদস্য বলেছেন, “নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে জাপা শেষ পর্যন্ত ভোট বর্জন করতে পারে।”
এদিকে, কিছুদিন আগে জাপা থেকে বের হয়ে যাওয়া দলটির সাবেক কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোদ রশিদ ও সাবেক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এবং রুহুল আমীন হাওলাদারও এখন সক্রিয়। তারা মূল দলে ফিরতে চান বলে গুঞ্জন রয়েছে।
কিন্তু জিএম কাদের বলছেন, ‘আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে তারা জাপাকে শেষ করেছে। ফের দলে তাদের জায়গা হবে না।’শীর্ষ ওই চার নেতা দলে ফিরতে না পারলে শেষ পর্যন্ত আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাপার সঙ্গে সমঝোতা করে ভোট করবেন বলে জানা গেছে।
১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে গড়া জাপা এখন ৬ খণ্ডে বিভক্ত। তার ভাই জিএম কাদেরের হাতে থাকা জাপা সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


