সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতেই হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনের আগে দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় নেমেছে বিএনপি। আর এজন্য বেপরোয়া নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দলের পক্ষ থেকে সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, কেউ যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো কাজ করে তাহলে তাকে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
সম্প্রতি একাধিক ভার্চুয়াল ভাষণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘প্রয়োজনে কিছু ব্যক্তিকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারও করা হতে পারে।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। যেকোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থের চেয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি এখন সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনের দিকে মনোনিবেশ করেছে এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় দলের সব সদস্যকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
নির্বাচন বিলম্বিত করতে পারে এমন যেকোনো ধরনের কাজ এড়িয়ে চলতেও দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তিনি সতর্ক করে এটাও বলেন যে, দেশের বর্তমান অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হতে দেওয়া যাবে না। নেতা-কর্মীদের মাঠে সতর্ক ও সক্রিয় থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বিধা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নেওয়া হবে না।’
যেকোনো মূল্যে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করার ওপর জোর দিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, বিরোধী দলগুলো বিএনপিকে দোষারোপ করতে পারে এমন কোনো সুযোগই সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না।
সম্প্রতি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এবং দেশব্যাপী বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন আয়োজিত কর্মসূচিগুলোতে এসব নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান।
দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে খুন, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের খবর। এর পরেও বিএনপি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দলটি বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে তারা নির্বাচন পেছানোর পক্ষপাতী নয়।
দলের নেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অবশ্য বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভিযোগ, নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র চলছে।
এসব বিষয় নিয়েই সম্প্রতি একাধিক বৈঠক করেছেন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। সেখানেও হত্যা ও গণপিটুনির ঘটনা বাড়তে থাকার বিষয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
বিএনপির নেতারা সতর্ক করে বলছেন, দেশে এখন রাজনীতির আড়ালে অপরাধ বাড়ছে। অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্রগুলো। তাই একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিএনপি ও জামায়াতসহ ছোট-বড় সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত।
কেবল শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বই যেকোনো ধরনের কারসাজি বন্ধ করে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনে সরকারকে চাপ দিতে পারে বলেও মনে করেন বিএনপির নেতারা।
এ অবস্থায় দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে এমন যেকোনো কাজের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তারেক রহমান। কেউ ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিএনপি। গত ৩ নভেম্বর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বৈঠকের পর ২৩৭টি আসনের জন্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। সেখানে জোট শরিকদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৩টি আসন।
এই শূন্য আসনগুলো দল এবং বিরোধী জোটের মধ্যে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অবশ্য নাম ঘোষণার পর থেকে কিছু আসলে সম্ভাব্য মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে এবং বিপক্ষে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সে বিক্ষোভ এখনো কোথাও কোথাও চলছে।
৬৩টি শূন্য আসনেও প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, যেখানে বিএনপি এবং জোটের প্রত্যাশীরা চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকার জন্য অপেক্ষা করার পাশাপাশি স্বতন্ত্রভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় স্থান পাওয়ার জন্য মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
তারেক রহমান বলেছেন, প্রতিটি আসনে একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। তিনি মনোনয়ের ক্ষেত্রে দলের সদস্যদের হাই কমান্ডের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এটাও বলেছেন যে, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং বিক্ষোভ সহ্য করা হবে না।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, ‘বাকি প্রার্থীদের নাম শিগগিরই ঘোষণা করা হবে, যা চলমান বিরোধের সমাধান করবে।’
বিএনপি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দলের সকল সদস্যকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের পিছনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই জ্যেষ্ঠ নেতার মতে, নির্বাচন বিলম্বিত করার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, এই গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করে চলেছে।


