নির্বাচনী আচরণবিধি: বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো?

নির্বাচনী আচরণবিধি: বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো?
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পোস্টারে ছেয়ে গেছে শহর। ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
Advertisement
Advertisement

সামনেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিছুদিনের মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা। তবে তার আগেই ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুনে ভরে গেছে শহর-বন্দর-গ্রামগঞ্জ। দলের প্রতীকসহ ভোট চাইছেন প্রার্থীরা। তবে কোনো পোস্টার-ব্যানারই প্রার্থী নিজে করেননি। পোস্টার-ব্যানারে ছাপানো ভাষা অনুযায়ী এসব প্রকাশ ও প্রচার করেছে তাদের অনুসারীরা। কোনো কোনোটিতে লেখা আছে ‘প্রচারে-এলাকাবাসী।’ শহরের চকচকে সুন্দর দেয়ালগুলো এখন এমনই সব পোস্টারে বিচিত্র রঙ ধারণ করেছে। যার দেয়াল, শুধু তিনিই জানেন ভোটের পরে এসব সরাতে তার কতটা ঝক্কি পোহাতে হবে, গাঁট থেকে তার কত টাকা খসবে।

শহর-বন্দরের দেয়াল চকচকে রাখতে এবার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনী আচরণবিধিতে পোস্টারকেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য অবশ্য মহৎ, নির্বাচনে প্রার্থীদের টাকার ছড়াছড়ি বন্ধ করা। একই উদ্দেশ্যে এর আগে পোস্টারের আকার ঠিক করে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। নিষিদ্ধ করেছিল রঙিন পোস্টার। গত ১০ নভেম্বর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ হয়েছে। এই বিধি অনুসারে আগামী সংসদ নির্বাচনে কোনো ধরনের পোস্টারই ব্যবহার করা যাবে না।

এখানেই যত সন্দেহ। এরই মধ্যে বড় দুই দলের প্রার্থীরা পোস্টারে এলাকা ভরে ফেলেছেন। নির্বাচন কমিশন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ সব কর্তৃপক্ষ এসব পোস্টার সরানোর নির্দেশ দিয়েই খালাস। দেয়াল থেকে সেগুলো সরাবে কে? প্রার্থীদেরকে সেগুলো সরাতে কীভাবে বাধ্য করবে কর্তৃপক্ষ? কারণ, পোস্টারের ভাষা অনুযায়ী প্রার্থী তো নিজে সেগুলো লাগাননি!

বাকি রইল যার দেয়াল, তাকেই সরাতে বলা। পোস্টার লাগিয়ে ‘অপরাধ’ করবেন একজন, আর এর ঝক্কি পোহাবেন দেয়ালের মালিক? অবশ্য এখন পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষ দেয়াল মালিককে পোস্টার সরাতে বলেনি।

পোস্টারের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বল্পশিক্ষিতের দেশে প্রার্থীরা পোস্টারের মাধ্যমেই নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেন। এটাই সহজ এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচের উপায়। পোস্টার নিষিদ্ধ হলে নিজেদের পরিচয় করাবেন কীভাবে? বড় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের বেলায় বিষয়টা একটু ভিন্ন। তাদের প্রতীক বা মার্কা সবাই চেনেন। তাই ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়’ স্লোগানে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ হয়তো সেই মার্কাকেই ভোট দেবেন। কিন্তু তাদের বাইরে যারা ভোটে দাঁড়াবেন, সাধারণ মানুষ তাদেরকে চিনবেন কীভাবে? বিশেষ করে গ্রামের মানুষজন?

আরও পড়ুন

সারা দেশে সংসদের আসন সংখ্যা ৩০০। গড়ে প্রায় দুটি উপজেলা নিয়ে একেকটি আসনের নির্বাচনী এলাকা। মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত বাছাইয়ের পর সাধারণত মাসখানেক প্রচারের সুযোগ পাওয়া যায়। এই সময়ে একজন প্রার্থীর পক্ষে কি দুটি উপজেলার সবগুলো গ্রামে যাওয়া সম্ভব? শহরের কাছাকাছি উপজেলাতে সম্ভব হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় অসম্ভব। এসব এলাকায় নিজের প্রার্থিতার কথা জানাতে এখন পর্যন্ত পোস্টারই একমাত্র ভরসা।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য প্রার্থীদের ভোটারের কাছে যাওয়ার ভিন্ন পথ খোলা রেখেছে। পোস্টার নিষিদ্ধ হলেও ব্যবহার করা যাবে লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড। তবে সেগুলোও দেয়াল বা খুঁটিতে সাঁটিয়ে দেওয়া যাবে না। হাতে হাতে বিলি করতে হবে, অথবা রশি দিয়ে টানিয়ে দিতে হবে। তাতে কি খরচ কমবে? মোটেই না। বরং বাড়বে। কারণ, তখন লিফলেট-হ্যান্ডবিল বিলি হবে হোটেল-রেস্তোরাঁ-দোকানপাট-যানবাহনে। ফলে সেগুলোর স্থায়ীত্ব হবে একদিন বা বড়জোর দু’দিন। দোকানপাটে সেগুলো পণ্য বিক্রির মোড়ক হিসেবে ব্যবহার হবে, নতুবা দোকান ঝাড়ু দেওয়ার সময় চলে যাবে ডাস্টবিনে। এবার নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়জুড়েই থাকবে শীতকাল, তাই কুয়াশায় সেগুলো একদিনেই নষ্ট হয়ে যাবে।

এ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুন বেশি লিফলেট-হ্যান্ডবিল ছাপবেন প্রার্থীরা। এতে খরচ হবে পোস্টারের চেয়ে অনেক বেশি।

প্রার্থীরা ব্যানার ও ফেস্টুনও টাঙাতে পারবেন, স্থাপন করতে পারবেন বিলবোর্ড। তবে ব্যানার-ফেস্টুন চট কিংবা কাপড়ের হতে হবে। পোস্টারে প্রচার করতে না পেরে প্রার্থীরা আরও বেশি ব্যানার-ফেস্টুন টাঙাবেন। স্থাপন করবেন বেশি বেশি বিলবোর্ড। এতেও খরচ বাড়বে। সবমিলিয়ে ফলাফল: প্রার্থীদের ব্যয় বাড়বে। ধনী প্রার্থীরা সেই ব্যয় বহন করতে পারবেন। কিন্তু তুলনামূলক ছোট দলের ‘দরিদ্র’ প্রার্থীদের অবস্থা হবে শোচনীয়।

এই তো গেল নির্বাচনী ব্যয়ের কথা। এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। নির্বাচনকে ‘উৎসবমুখর’ করে তুলতে বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। নির্বাচন কমিশনও সেটাই চায়। বাংলাদেশের মতো সমাজে ‘নির্বাচনী উৎসবে’র প্রধান অনুষঙ্গ পোস্টার। সহজে বেশিদিন টিকে থাকে, আবার খরচও কম। কোনো এলাকায় পোস্টার না থাকলে মনেই হয় না সেখানে কোনো নির্বাচন হচ্ছে। অথচ ব্যানার-ফেস্টুনের মতো ব্যয়বহুল উপাদান বহাল রেখে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পোস্টার। বিষয়টা কেমন খটমট না?

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad