নিরাপদ আমের পথে সংকটের দেয়াল

নিরাপদ আমের পথে সংকটের দেয়াল
Advertisement
Advertisement

দেশের বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী জেলা নওগাঁয় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদিত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়। রপ্তানিযোগ্য, নিরাপদ ও কীটনাশকমুক্ত আম উৎপাদনের জন্য চাষীরা দীর্ঘদিন ধরে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি অনুসরণ করে আসছেন। তবে চলতি মৌসুমে ফ্রুট ব্যাগের তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়েছেন জেলার হাজারো আমচাষী। চাহিদা অনুযায়ী ব্যাগ না পাওয়ায় অনেকেই কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আমে ব্যাগিং করতে পারেননি। ফলে উন্নতমানের আম উৎপাদন ও অধিক লাভের সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁ জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এ বছর প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর ও পত্নীতলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে আমের বাগান, যা জেলার মোট আমচাষের প্রায় ৭০ শতাংশ। এসব এলাকায় আম্রপালি, গোপালভোগ, খিরসাপাত, হিমসাগর, বারি-৪, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাংগোসহ প্রায় ১৬টি জাতের আম উৎপাদিত হচ্ছে।

প্রতিবছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও গৌড়মতি জাতের আমে ফ্রুট ব্যাগিং করা হয়। এই পদ্ধতিতে আমের গায়ে দাগ পড়ে না, পোকার আক্রমণ কমে যায় এবং কীটনাশকের ব্যবহারও হ্রাস পায়। ফলে আমের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় এবং দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশি বাজারেও চাহিদা তৈরি হয়। খোলা অবস্থার আম যেখানে প্রতি মণ সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, সেখানে ফ্রুট ব্যাগিং করা আমের দাম প্রকারভেদে সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়।

কিন্তু চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি ভিন্ন। গত বছর যেখানে প্রতিটি ফ্রুট ব্যাগ ৩ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৮০ পয়সায় পাওয়া গেছে, সেখানে এ বছর সেই ব্যাগ কিনতে হয়েছে ৬ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত দামে। তাও প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ পাওয়া যায়নি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক চাষী পরিকল্পিত পরিমাণ আমে ব্যাগিং করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

পোরশা উপজেলার বন্ধুপাড়া গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রায়হান আলম জানান, তার ২২০ বিঘা জমিতে আম্রপালি, গৌড়মতি ও বারি-৪সহ বিভিন্ন জাতের আমের বাগান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে রপ্তানিযোগ্য ও নিরাপদ আম উৎপাদনের লক্ষ্যে তিনি ৬০ বিঘা জমির প্রায় ৫ লাখ আমে ফ্রুট ব্যাগিং করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো পর্যাপ্ত ব্যাগ না পাওয়ায় আম্রপালি, ব্যানানা ম্যাংগো ও বারি-৪ জাতের আমে ব্যাগিং করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি গৌড়মতি জাতের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ আমে ব্যাগিং করতে পেরেছেন। এজন্য তাকে প্রতিটি ব্যাগের জন্য আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফ্রুট ব্যাগিং করা আমের বাজারমূল্য অনেক বেশি। কিন্তু ব্যাগের সংকটের কারণে এ বছর সেই অতিরিক্ত লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

একই উপজেলার সাদেরডাঙ্গা গ্রামের আমচাষী বাবুল আক্তার বলেন, তার ১৬ বিঘা জমির আমবাগানের অর্ধেকই আম্রপালি জাতের। গত বছর ২০ হাজার আমে ব্যাগিং করে ভালো দাম পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এ বছর ৫০ হাজার আমে ব্যাগিং করার পরিকল্পনা থাকলেও পর্যাপ্ত ব্যাগের অভাবে মাত্র ১০ হাজার গৌড়মতি আমে ব্যাগিং করতে পেরেছেন। তিনি জানান, গত বছর যে ব্যাগ ৩ টাকা ৮০ পয়সায় কিনেছিলেন, এবার সেই একই ব্যাগ কিনতে হয়েছে ৬ টাকা ২০ পয়সা দরে। তার মতে, ব্যাগিং না করতে পারায় পোকার আক্রমণও বেড়েছে, যা ফলের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র এগ্রোর উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, তার প্রয়োজন ছিল প্রায় তিন লাখ ফ্রুট ব্যাগ। কিন্তু সংগ্রহ করতে পেরেছেন মাত্র ১৫ হাজার। গত বছরের অবশিষ্ট ৪৫ হাজার ব্যাগসহ মোট ৬০ হাজার ব্যাগ ব্যবহার করে কিছু আমে ব্যাগিং করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, “গৌড়মতি ও ব্যানানা ম্যাংগোসহ কিছু জাতের আমে ফ্রুট ব্যাগিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাগিং না করলে ফলের গায়ে দাগ পড়ে এবং পোকার আক্রমণ বেড়ে যায়। প্রয়োজনীয় ব্যাগের অভাবে আমার প্রায় ২৫ লাখ টাকার সম্ভাব্য আয় কমে যেতে পারে।

চাষীদের মতে, গত কয়েক বছরে নতুন করে অনেক আমবাগান গড়ে উঠেছে। তিন থেকে চার বছর আগে রোপণ করা গাছগুলো এবার পূর্ণমাত্রায় ফল দিতে শুরু করায় ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। পাশাপাশি নিরাপদ ও রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাগের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি।

অন্যদিকে, আমচাষীরা মনে করেন, নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে তারা সরাসরি বিদেশে আম রপ্তানি করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগী বা রপ্তানিকারকদের কাছে কম দামে আম বিক্রি করতে হয়। রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কৃষকবান্ধব করা হলে জেলার অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি কৃষকরাও ন্যায্য মূল্য পাবেন।

এ বিষয়ে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বলেন, রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে ফ্রুট ব্যাগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) অনুসরণ করে নিরাপদ আম উৎপাদনে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ফ্রুট ব্যাগের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে মৌসুমের শেষ দিকে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ ব্যাগ সরবরাহ করতে পারেনি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad