নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপদ নগরী গড়ে তোলার দাবিতে ১৬ দিনব্যাপী জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ প্রচারাভিযান শুরু করেছে বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ।
বিশ্বজুড়ে পালিত এই ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে বুধবার ‘নিরাপদ নগরী, নির্ভয় নারী’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল।
কর্মসূচির শুরুতে শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্টোরিজ অফ কারেজ’ শীর্ষক আউটডোর পারফরম্যান্স ও ইনস্টলেশন সিরিজ। যেখানে নারীদের সাহস ও প্রতিকূলতা মোকাবিলার গল্পগুলো তুলে ধরা হয়।
এরপর চিত্রশালা মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় ‘ইকোজ অফ হার লাইফ’ নামে একটি নাটক। এতে গণপরিবহন, পাবলিক স্পেস এবং সেবাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের দৈনন্দিন হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়।
নগরীতে অনলাইন ও অফলাইনে নারীরা কেমন নিরাপদ আছেন সে বিষয়টি তুলে ধরেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিমের লিড মরিয়ম নেছা।
নাটক মঞ্চায়নের ফাঁকে অনুষ্ঠিত ইন্টারেক্টিভ আলোচনায় বক্তারা নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ, জেন্ডার-সংবেদনশীল নগর পরিকল্পনায় সংস্কার এবং সামাজিক নৈতিকতার উন্নয়নের ওপর জোর দেন।
বক্তারা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষা পাঠক্রমে সচেতনতার বিষয়টি যোগ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
নিরাপদ নগরী ক্যাম্পেইনের আওতায় অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ ও ২০২২ সালে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা ৬৩ শতাংশ হয়েছে। এর কারণে ৪২ শতাংশ নারী তাদের অনলাইন উপস্থিতি কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া, ৬৩ শতাংশ নারী ভয় বা আশঙ্কা নিয়ে বাইরে বের হন এবং গণপরিবহনে ২২ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন।’
তিনি বলেন, এসব তথ্য প্রমাণ করে যে নারীরা অনলাইন বা অফলাইন কোনো ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
সহিংসতা অব্যাহত থাকার প্রধান কারণ হিসেবে প্রশ্রয় এবং জবাবদিহিতার অভাবের কথা তুলে ধরেন তিনি। এক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সহযোগী হিসেবে সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক সহিংসতা বাড়ার পেছনে ‘কালচারাল ভায়োলেন্স’ এবং সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতাকে দায়ী করেন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘পুরুষ ও ছেলেদের ইতিবাচক সংস্কারের মাধ্যমে সহযোগী হিসেবে না রাখতে পারলে সহিংসতা কমবে না। সরকার ও নাগরিক সমাজকে মিলে প্রতিরোধমূলক কাজে মনোযোগ দিতে হবে।’
ডিএনসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এস এম শফিকুর রহমান নগরীর নকশায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেন্ডার-সংবেদনশীল পরিকল্পনা নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
ডিএমপির উপ কমিশনার মোছা. ফারহানা ইয়াসমিন যেকোনো সহিংস ঘটনায় দ্রুত রিপোর্ট করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং থানায় নারী পুলিশদের জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে ইউএনডিপি-এর জেন্ডার টিম লিড শারমিন ইসলাম গণপরিসরে সিসিটিভি নজরদারি জোরদার এবং জেন্ডার বাজেট বৃদ্ধি করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা ফখরুল আরেফিন খান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহকারী পরিচালক জেসমিন আরাসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।


