বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা জরুরি সংস্কার না করলে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে দেশ বলে সতর্ক করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে চীনের বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ: অগ্রগতির পথ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেন আলোচকরা। সিপিডি ও বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য শক্তি ফোরাম এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
এ আলোচনায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও আবরার আহাম্মেদ ভুঁইয়া যৌথভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে; সরকার প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩১টি সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে, যেখানে এরই মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এতে নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাতিল হওয়া এই ৩১টি প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। ১৫টি কোম্পানি ইতোমধ্যে সরকারের সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় জমি কিনে ফেলেছিল। প্রকল্প বাতিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। কারণ, তারা এরই মধ্যে কর পরিশোধসহ আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদও দিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি একক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নেই। বিনিয়োগকারীদের একাধিক ওয়েবসাইটে যেতে হয়, অনেক সরকারি অফিসে সশরীরে উপস্থিত থাকতে বাধ্য হতে হয়। এটি বিনিয়োগকারীদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষক আবরার আহমেদ। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা, জমির অভাব, অস্বচ্ছতাসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিবেদনে এই খাতে চীনের বিনিয়োগের সমস্যার কথা তুলে ধরে দেশটির জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং বিনিয়োগের প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানানো হয়।
গবেষক আবরার আহমেদ বলেন, ‘বিপিডিবি উন্মুক্ত দরপত্র এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। তবে বেশ কয়েকটি কার্যক্রম এবং কাঠামোগত সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আংশিক কাগজ নির্ভর।’
বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন অফিসে উপস্থিত হয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এটি প্রশাসনিক বিলম্ব এবং ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্থানীয় অফিসে সমস্যার মুখে পড়েন। এছাড়া এই ধরণের বিনিয়োগে দীর্ঘকালীন এবং বহুস্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের পরে, প্রস্তাবগুলোকে বিপিডিবি, মন্ত্রণালয়, সরকারি কেনাকাটা সম্পর্কিত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির মাধ্যমে এগোতে হয়। এই বাড়তি ছাড়পত্রের সময়সীমা প্রধান বিনিয়োগকারীদের অনুৎসাহিত করে। যেখানে ভারতে এসব বাস্তবায়নে ৩-৪ মাস সময় লাগে, বাংলাদেশে এক বছরের বেশি সময় লেগে যায়। এর ফলে আর্থিক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। নানান ধরণের নথি, একাধিক লাইসেন্স সার্টিফিকেট, তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা নবায়নযোগ্য বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদেশি বিনিয়োগের ৫০ শতাংশই চায়নার। অন্তর্বর্তী সরকার ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করেছে। যার মধ্যে ১৫টি কোম্পানি জমি কিনেছে, সরকারকে কর দিয়েছে। তারা অনেক বিনিয়োগ করেছে।
প্রতিবেদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সহজ করতে ডিজিটালাইজেশন, নীতি প্রক্রিয়া বারবার পরিবর্তন না করা, আইনগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের গাইড করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এসব সমস্যার সমাধানে বিডাকে এগিয়ে আসতে হবে। বিনিয়োগর সব সুবিধা নিশ্চিতে বিডা সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে।


