রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ভাংনি ইউনিয়নের কাগজিপাড়া-ফকিরটারি এলাকায় ঘাঘট নদীর ভাঙনে ২৫০ মিটার রাস্তা বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে গত ২৫ বছর ধরে মিঠাপুকুর ও পীরগাছা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় ২৫টি গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে যাতায়াতের এই সমস্যার কারণে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২৬ বছর আগে মিঠাপুকুরের ঠাকুরবাড়ী থেকে পীরগাছার দেউতিগামী এলজিইডির ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের রাস্তাটির একাংশ নদীতে বিলীন হয়। কাগজীপাড়ার জাইদুল ইসলামের দোকানের পাশ থেকে ফকিরটারী মসজিদ পর্যন্ত অংশটি নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় মিঠাপুকুরের ভাংনি, পায়রাবন্দ, বালারহাট এবং পীরগাছার পারুল ইউনিয়নের গ্রামগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমানে এই গ্রামগুলোর মানুষকে উপজেলা সদরে যেতে ২০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক ও শিক্ষার্থীরা। রাস্তার উত্তর ও দক্ষিণ দুই প্রান্তেই অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আছে কাগজিপাড়া আশরাফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, ঠাকুর বাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দেউতি মহাবিদ্যালয় ও মেকুড়া কামিল মাদরাসাসহ অন্তত অর্ধশত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। রাস্তা না থাকায় শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা বা দীর্ঘ পথ ঘুরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করছে।
পীরগাছার দেউতি হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সোহেল ইসলাম জানায়, রাস্তা থাকলে সে ৬ কিলোমিটার পথ চালিয়ে স্কুলে যেতে পারত। কিন্তু এখন তাকে ১০-১২ কিলোমিটার বাড়তি পথ পাড়ি দিতে হয়, যার জন্য পড়াশোনা ফেলে অনেক আগে প্রস্তুতি নিতে হয়।
ফকিরটারি গ্রামের মোখতার আলম জানান, বন্যার সময় শিশুদের নৌকায় করে স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে।
কাগজিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কফিল উদ্দিন জানান, ২৫ বছর ধরে তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন। ফকিরটারি বা পীরগাছা লাইনে সরাসরি যাওয়ার কোনো উপায় নেই। মাঠেরহাট এলাকার আব্দুর রউফ জানান, রাস্তা না থাকায় অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার ঘুরে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে যায়।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় চাষিরা। দক্ষিণটারী গ্রামের আশিকুর রহমান জানান, ঘাঘট পাড়ের উৎপাদিত ফসল পরিবহনের অভাবে পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বয়োবৃদ্ধ কৃষক মনছুর আলী ও আব্দুর রশিদ জানান, এক সময় এই রাস্তাটি রংপুর থেকে গাইবান্ধা পর্যন্ত সংযুক্ত ছিল। এখন রাস্তা না থাকায় অনেক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। গ্রামের ভেতর দিয়ে রিকশা বা অটো চলার মতো পরিস্থিতিও নেই।
ব্যবসায়ী মজিবর রহমান ও কৃষক লুৎফর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, এলাকায় ধান, আলু, ভুট্টা ও কলার প্রচুর ফলন হলেও যাতায়াত খরচের ভয়ে পাইকাররা আসতে চান না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে মাঠেই ফসল বিক্রি করতে হয়।
আব্দুর হালিম নামের এক বাসিন্দা জানান, বর্ষার সময় ভুলায় করে ফসল পারাপার করতে হয়, অন্যথায় ফসল পচে নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ধরণা দিলেও কোনো সমাধান মেলেনি বলে জানান আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ নুরুজ্জামান।
ভাংনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন ওয়াহেদী জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এলজিইডি, ডিসি ও ইউএনও অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছেন। বর্তমানে স্থানীয় এমপির ডিও লেটারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, তারা এলাকাটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এই রাস্তা ঘাঘট নদীতে বিলীন হওয়ার বিষয়টি ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী জানান, নির্বাচনের আগে এই রাস্তাটি করার প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন। নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ডিও লেটার দিয়েছেন। আড়াই দশকের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


