নথিপত্রে জালিয়াতি: ঝুঁকির মুখে খুলনার বড় পানি প্রকল্প

নথিপত্রে জালিয়াতি: ঝুঁকির মুখে খুলনার বড় পানি প্রকল্প
Advertisement
Advertisement

খুলনায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিশাল পানি সরবরাহ প্রকল্পে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্পের জন্য জমা দেওয়া সরকারি টেন্ডারের নথিপত্র জাল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর হাতে আসা নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এই জালিয়াতি করেছে ‘চায়না কনস্ট্রাকশন সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো লিমিটেড’ এবং ‘আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেড’-এর একটি যৌথ ব্যবসায়িক গ্রুপ। তারা নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জাল করে জমা দিয়েছে। এই গ্রুপটি দরপত্রের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করতে না পারলেও তাদের দরপত্র বাতিল করা হয়নি। এই জালিয়াতির কারণে খুলনার মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

খুলনা ওয়াসা ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)’ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের ১, ২ এবং ৫ নম্বর প্যাকেজের আন্তর্জাতিক টেন্ডারে জালিয়াতির এই ঘটনা ঘটে। এই যৌথ গ্রুপের জমা দেওয়া তিনটি টেন্ডারের মধ্যে দুটিকে খুলনা ওয়াসার মূল্যায়ন কমিটি ইতিমধ্যে সব দিক থেকে সঠিক ঘোষণা করেছে। সবার সামনে তাদের আর্থিক প্রস্তাবগুলোও খোলা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো ২ ও ৫ নম্বর প্যাকেজে এই জালিয়াতি করা গ্রুপটিই সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে। বাকি একটি প্যাকেজের কারিগরি মূল্যায়ন এখনো চলছে। সাত সদস্যের এই মূল্যায়ন কমিটির প্রধান হলেন খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঝুমুর বালা।

খুলনার পানি সংকটে এই প্রকল্পের গুরুত্ব

খুলনা শহরের দীর্ঘদিনের পানি সংকট মেটানোর প্রধান ভরসা হলো এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়। প্রায় দুই হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো মধুমতী নদী থেকে বাড়তি পানি আনা এবং পানি শোধন করার ক্ষমতা দিনে ১৩ কোটি লিটারে নিয়ে যাওয়া। এই পরিকল্পনায় ১১ কোটি ৫০ লাখ লিটার নদীর পানি শোধন করে জমিয়ে রাখার ব্যবস্থা আছে, যাতে শুকনো মৌসুমে পানির অভাব না হয়। এছাড়া শহরের পানির অভাব দূর করতে ৭৫টি শক্তিশালী পাম্পের মাধ্যমে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ পানি তোলার পরিকল্পনাও আছে।

যেভাবে ধরা পড়ল জালিয়াতি

টেন্ডারের কারিগরি মূল্যায়ন চলাকালীন একটি সনদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তখন খুলনা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রামেশ্বর দাসের কাছে এটি যাচাই করতে পাঠায়।  কারণ তার নামেই ওই সনদ ইস্যু করা হয়েছিল। রামেশ্বর দাস নথিপত্র দেখে স্পষ্টভাবে জানান যে, খুলনা ওয়াসায় জমা দেওয়া সনদটি আসল নয়। তিনি বলেন, তার দেওয়া মূল সনদটি জালিয়াতি করে অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, টেন্ডারে ভুয়া তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এডিবি’র অর্থায়ন করা প্রকল্পে কঠোর নিয়ম মেনে কাজের অভিজ্ঞতার সনদ জমা দিতে হয়। কিন্তু এই গ্রুপটি তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে ভুয়া সনদ ব্যবহার করেছে। এই বিষয়ে এডিবি জানিয়েছে, তাদের সব প্রকল্প নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে এবং বর্তমানে তাদের একটি টিম এই অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলছে।

আইনি ব্যবস্থা ও শাস্তি

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সরকারি কাজে ভুয়া বা জাল নথিপত্র ব্যবহার করা একটি অপরাধ। এর জন্য সাত বছর পর্যন্ত জেল ও জরিমানা হতে পারে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, জালিয়াতি করলে ওই প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার বাতিল এবং তাদের কয়েক বছরের জন্য নিষিদ্ধ বা কালো তালিকাভুক্ত করা যায়। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রকল্পের ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম হলে বিদেশের মাটিতেও ওই প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ হতে পারে। জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও কেন এই গ্রুপের টেন্ডার বাতিল করা হয়নি, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।

অভিজ্ঞতার তথ্য যেভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে

টেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী, প্যাকেজ ২-এর জন্য ঠিকাদারের অন্তত ২০টি গভীর নলকূপ বসানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হতো। আবার প্যাকেজ ৫-এর জন্য অন্তত ৫ কিলোমিটার পানির পাইপলাইন বিশেষ পদ্ধতিতে (ড্রিলিং) বসানোর অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।

কিন্তু ঢাকা ওয়াসার আসল নথিপত্র বলছে, ওই গ্রুপটি মাত্র ১০টি নলকূপ বসিয়েছিল এবং বিশেষ ড্রিলিং পদ্ধতিতে পাইপ বসিয়েছিল মাত্র এক হাজার ২৫৮ মিটার। অথচ তারা জাল সনদে ড্রিলিংয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে পাঁচ হাজার ২৫৮ মিটার দেখিয়েছে। এত প্রমাণ থাকার পরও তাদের আবেদনটি বাতিল না করে এখনো বৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী রামেশ্বর দাস জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, খুলনা ওয়াসা তাকে ইমেইলে বিষয়টি জানিয়েছিল। তিনি একে বড় ধরনের অনিয়ম বলে অভিহিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, এই টেন্ডার বাতিল হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ঢাকা ওয়াসা এই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত করবে।

অন্যদিকে, আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেডের মূল প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ দাবি করেছে তারা কোনো জাল সনদ দেয়নি। তাদের মতে, বড় ব্যবসা হওয়ার কারণে তারা অনেক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে এবং হয়তো তাদের ক্ষতি করার জন্য অন্য কেউ এসব জাল কাগজ জমা দিয়েছে।

খুলনা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। এই অনিয়মগুলো তদন্ত করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পানির জন্য হাহাকার

টেন্ডার নিয়ে এই সমস্যার কারণে প্রকল্পটি দেরি হলে খুলনার মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। খুলনা ওয়াসার তথ্য মতে, শহরে দিনে ২৪ কোটি লিটার পানির দরকার। এর প্রায় ৯৯ শতাংশই আসে ভূ-গর্ভস্থ পানি থেকে। কিন্তু শুকনো মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় হাহাকার শুরু হয়। এই সমস্যা দূর করতেই ২০১১ সালে প্রথম এই প্রকল্প শুরু হয়।

জাপানি সংস্থা জাইকা ও এডিবির সহায়তায় প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০১৮ সালে শেষ হয়। তখন পাইপলাইন ও পানি শোধনাগার তৈরি করা হয়েছিল ৪৫ হাজার পরিবারের জন্য। কিন্তু শুকনো মৌসুমে নদীর পানি নোনা হয়ে যাওয়ায় ওই ব্যবস্থা অনেক সময় কাজ করে না। তাই দ্বিতীয় পর্যায়টি সফল হওয়া খুলনার জন্য খুবই জরুরি।

দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষ্যগুলো কী কী

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনার পানি সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবে। প্রকল্পের দুই হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার মধ্যে এক হাজার ৮২১ কোটি টাকা দিচ্ছে এডিবি, বাকি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এই পরিকল্পনায় ২৫৮ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন, ২৫ হাজার ৮০০ পরিবারকে মিটারের মাধ্যমে পানির সংযোগ এবং বিশাল আকারের পানির ট্যাংক ও রিজার্ভার বানানো হবে। এছাড়া পানি শোধনাগারগুলোর ক্ষমতা অনেক গুণ বাড়ানো হবে যাতে শহরজুড়ে পানির জোগান ঠিক থাকে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad