গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এক বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার বসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর নানামুখী চ্যালেঞ্জ, রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির দায়বদ্ধতা নিয়ে এই সংসদের পথচলা শুরু হচ্ছে।
এবারের সংসদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি ভঙ্গুর অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয় ও শঙ্কা।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার যে অঙ্গীকার নিয়ে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, সেটি শেষ পর্যন্ত অতীতের গতানুগতিক ধারায় ফিরে যাবে নাকি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইতিহাস গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ প্রসঙ্গে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির প্রধান মঞ্চ।
তিনি মনে করেন, ইতিপূর্বে গণআন্দোলনের পর গঠিত সংসদগুলো মানুষের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে এবারের সংসদ নতুন ধারা তৈরি করবে কি না, তা অধিবেশন শুরু না হলে বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবার অনেকাংশে পূরণ হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের নজির নতুন নয়। ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুললেও গত তিন দশকে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংসদ বর্জন এবং সংঘাতের কারণে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী ‘টাইমস’কে বলেন, গত তিনটি সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি ও সংসদীয় কমিটির অকার্যকারিতার কারণে সংসদ প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এবার সরকার ও বিরোধী দল কার্যকর ভূমিকা পালন করে দেশ সংস্কারের পথে নিতে পারে। তা না হলে ফের পুরোনো ব্যবস্থা ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান জানান, বিএনপি শুরু থেকেই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমেই তার প্রমাণ মিলছে। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে তারা আশাবাদী।
তবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সরকারি দল প্রথম দিন থেকেই সংস্কারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে যা মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার দেশবিরোধী কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে এর বিরুদ্ধে তারা রাজপথেও সক্রিয় থাকবেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর প্রায় দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
অন্যদিকে, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয় জামায়াত জোট। এছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে আয়োজিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। ফলে সংসদে নীতিনির্ধারণী বিতর্ক ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি নতুন পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এবারের সংসদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ৭৬ শতাংশ সদস্যই নতুন মুখ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনই নতুন সংসদ সদস্য। তরুণ ও প্রথমবার নির্বাচিত এই সদস্যদের বড় অংশই ছাত্র রাজনীতি বা নাগরিক আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তারা দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যেসব অঙ্গীকার করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করা বর্তমান অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছে। রক্তের ঋণ শোধ করতে তাদের পরিবর্তনের পথেই হাঁটতে হবে। অন্যথায় সংসদ ও রাজপথ-উভয় জায়গায় কঠোর প্রতিবাদ হবে।
সংসদের শুরুতেই কয়েকটি ইস্যুতে উত্তাপ ছড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ আমলের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ নিয়ে বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি রয়েছে। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে তারা ইতিমধ্যে তার পদত্যাগ দাবি করেছে।
সবশেষে বলা যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হবে নতুন সংসদের বড় পরীক্ষা। সংসদ যদি সত্যিকার অর্থে নীতিনির্ধারণের কার্যকর মঞ্চে পরিণত হয় এবং সংসদ সদস্যরা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন, তবেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। এই কঠিন পরীক্ষায় নতুন সংসদ কতটুকু উত্তীর্ণ হয়, তা দেখার অপেক্ষায় দেশের মানুষ।


