শিক্ষা খাতের বর্তমান সংকট এড়িয়ে কেবল পরীক্ষার নকল নিয়ে বারবার কথা বলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রীর এমন অতি আগ্রহের কারণে শিক্ষা খাতের গভীর ও কাঠামোগত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ৬৯ বছর বয়সী এই মন্ত্রী ছোট শিশুদের পড়াশোনা করার এবং নকল না করার নসিহত দিচ্ছেন। তার এই মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এত ছোট শিশুরা আদৌ নকলের বিষয়টি বোঝে কি না তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া মিলন তার প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায় নকল প্রতিরোধের বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এটিকে অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা মনে করেন মন্ত্রীর এই অবস্থান বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একেবারেই বেমানান।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ এ বিষয়ে টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।
মনজুর আহমেদ মনে করেন পরীক্ষা সব কিছু নয়। তার মতে, সব মনোযোগ যদি পরীক্ষার দিকে চলে যায় তবে শিক্ষার মান, স্কুল ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অবহেলিত থেকে যায়।
এক সময় নকল ছিল দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে একটি ভয়াবহ সমস্যা। বিশেষ করে ২০০১ পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মিলন যখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তখন ব্যাপক অনিয়মের কারণে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই সময় কিছু শিক্ষার্থী কেবল নকল করার সুযোগ পাওয়ার জন্যই নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতো। তখন নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে আসে।
এ ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে এবং সনাতন পদ্ধতিতে নকল করার ঘটনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
বর্তমান সময়ের অনেক শিক্ষাবিদ দাবি করেন, এই বিষয়টি নিয়ে এখন এত বেশি মাতামাতি করার কোনো প্রয়োজন নেই। ঢাকার একটি নামকরা সরকারি স্কুলের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মন্ত্রী বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছেন। ওই শিক্ষকের মতে, মন্ত্রী পরীক্ষার পদ্ধতির পরিবর্তনগুলো মাথায় নিচ্ছেন না।
বর্তমানের সৃজনশীল বা নতুন পদ্ধতির প্রশ্নপত্রে নকলের কাগজ নিয়ে হলে ঢোকা এখন আর কার্যকর কোনো উপায় নয়।
সমালোচকদের মতে শিক্ষাব্যবস্থার আসল চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। মনজুর আহমেদ জানান, দেশের প্রায় অর্ধেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। অনেক সরকারি ও এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও স্থায়ী কোনো নেতৃত্ব ছাড়াই চলছে। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেন।
মনজুর আহমেদের মতে, সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া স্কুল পরিচালনা বা শিক্ষার মানোন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাদার প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত দুটি উপদেষ্টা কমিটি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার সুপারিশ জমা দিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে নকলের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে অনুষ্ঠিত প্রথম এইচএসসি পরীক্ষায় সারা দেশে মাত্র ৪৩ জন পরীক্ষার্থীকে অসদুপায় অবলম্বনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এই সংখ্যা ২০২৪ সালে ছিল ২০ জন, ২০২৩ সালে ৪ জন এবং ২০২১ সালে ছিল ২১ জন।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার বলেন, পুরোনো পদ্ধতির নকল করার প্রবণতা এখন নেই বললেই চলে। তবে তিনি ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে নকল করার নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সতর্ক করেন। অনেক সময় কেন্দ্রর বাইরে থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে উত্তর সরবরাহ করা হয়। তিনি এই বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে এর প্রতিকার প্রয়োজন বলে মনে করেন।
অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, পরীক্ষার যেকোনো পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা সবসময়ই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এখন আরও ব্যাপক সংস্কারের দাবি তুলছেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান জাতীয় শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর জন্য একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, নীতিনির্ধারকরা আসল সমস্যাগুলো সমাধান না করে নকলের মতো বিষয়গুলোকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছেন। তার মতে, নীতিনির্ধারণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রকৃত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারছেন না। এমনকি কী করা উচিত সে সম্পর্কেও তাদের সঠিক ধারণা নেই বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান।
মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রূপ ও মিম তৈরি হলেও এসব নিয়ে মোটেও বিচলিত নন মিলন। গত ১৩ এপ্রিল যশোরে এক শিক্ষক সমাবেশে তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতি এই মনোযোগ তিনি উপভোগ করছেন। ফেসবুকে তাকে নিয়ে হওয়া ট্রলগুলো দেখে তিনি মজা পান বলেও জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, মানুষ শিক্ষা খাতের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেই তাকে নিয়ে এমন আলোচনা করছে। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষকদের ওপরই বর্তায়। তিনি সরাসরি শিক্ষকদের কাছে জানতে চান তারা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন চান কি না।
এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্যের জন্য টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


