প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলন পাওয়া সত্ত্বেও নওগাঁর আউশ চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। উৎপাদিত ধান বাজারে এনে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় তাদের হিসাব মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না, যা বাম্পার ফলনের আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।
একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারদর পতন, অন্যদিকে ঋণের চাপ, পারিবারিক ব্যয় এবং আসন্ন আমন চাষের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে আউশের ভালো ফলন সত্ত্বেও কৃষকের হাতে কাঙ্ক্ষিত আয় থাকছে না।
জেলার বিভিন্ন ধানের হাট ঘুরে দেখা গেছে, জিরাশাইল, কাটারি ও বিআর-২৮ জাতের ধান বর্তমানে প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার জাতভেদে প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বিপরীতে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, জমি প্রস্তুত ও শ্রমিকের মজুরিসহ চাষাবাদের প্রতিটি খাতের ব্যয় বেড়েছে। ফলে মূলধন হারানোর আশঙ্কায় অনেকে বম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৪৭৩ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি একর জমিতে আউশ উৎপাদনে গড়ে খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা, যা বিঘাপ্রতি প্রায় ২১ হাজার টাকা।
তবে কৃষকদের হিসাবে বাস্তব চিত্র আরও কঠিন। বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২২ মণ ধান পেয়ে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে আয় আসছে ১৬ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে বিক্রির টাকায় উৎপাদন খরচই উঠছে না।
ধান কাটার পরই কৃষকদের ঋণের কিস্তি, জমির বর্গার টাকা পরিশোধ ও সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর চাপ থাকে। ফলে দাম কম হলেও তাদের ধান ধরে রাখার সুযোগ থাকে না। রাণীনগর উপজেলার কালিগ্রামের কৃষক মোজাফফর হোসেন আবাদপুকুর হাটে হতাশা প্রকাশ করে জানান, কম দামে ধান বিক্রি করলে চাষের খরচই ওঠে না। কিন্তু সংসারের খরচের তাগিদে বাধ্য হয়েই কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
মহাদেবপুর উপজেলা সদরের হাটে মহিষবাতান গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে ১০ মণ জিরাশাইল ধান বিক্রি করে বলেন, ‘আমাদের দুঃখ-কষ্ট কেউ দেখে না। পরিবহন খরচের ভয়ে ধান ফেরত না নিয়ে কম দামেই বেচে দিয়েছি। অথচ গত বছর একই ধান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলাম।’
মান্দা উপজেলার মৈণম গ্রামের বর্গা চাষি দিলীপ দাস চার বিঘা জমিতে আউশ চাষ করতে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। ধানের দাম পড়ে যাওয়ায় ঋণের টাকা পরিশোধ ও সংসার চালানো নিয়ে তিনি ঘোর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
নওগাঁর চকগৌরি এলাকার ধান ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম জানান, আউশ বাজারে আসার পর থেকেই বাজার নিম্নমুখী। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কমেছে। বর্তমানে কাটারি ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা, জিরাশাইল ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং বিআর-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
উৎপাদন খরচ ঊর্ধ্বমুখী হলেও বাজারদর নেমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একর আউশ উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে পারলে কৃষক লাভবান হতেন।
তিনি বলেন, কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কেনা হলেও নওগাঁর বাজারে মোটা ও সরু চাল আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন পর্যায়ে ধানের দর কমলেও সেই সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
চালকল মালিকদের মতে, গত বোরো মৌসুমে দেশে ভালো উৎপাদনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল আমদানি হওয়ায় বাজারে পর্যাপ্ত মজুত তৈরি হয়েছে। ফলে দেশীয় চালের চাহিদা কমেছে। এছাড়া করপোরেট পর্যায়ে বিক্রি কমায় মিলাররাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।
নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, বিপুল পরিমাণ চাল আমদানির কারণে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমে গেছে। সামনে আমন মৌসুম আসছে, পরিস্থিতি এমন থাকলে সে সময়ও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
কৃষকদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ানোই নয়, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার না করা হলে ভালো ফলনও লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


