আগামী ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশিত নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনের সময় কেমন করে দূরে থাকব? নির্বাচনের সময় জনগণের সাথে জনগণের মাঝেই থাকবো ইনশাআল্লাহ।’
গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই আলোচনায় ছিল তারেক রহমানের দেশের ফেরার প্রসঙ্গ।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশ কিছু মামলা হয় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান বিএনপির এই নেতা তখন থেকে পরিবারসহ সেখানেই বসবাস করছেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর এই প্রথম গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন তারেক রহমান।
আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই তারেক রহমানের ফেরার আশায় ছিলেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। এক বছরে একে একে বিভিন্ন মামলার দায় থেকে মুক্তি পেলেও দেশে ফেরা হয়নি তার।
সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘কিছু সংগত কারণে হয়তো এখনও ফেরাটা হয়ে ওঠেনি। তবে সময় তো মনে হয় চলে এসেছে। ইনশআল্লাহ দ্রুতই ফিরে আসব।’
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। সেই অনুযায়ী চলছে প্রস্তুতিও। নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও কর্মীর একটি ওতপ্রত সম্পর্ক। জনগণের প্রত্যাশিত নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনের সময় কেমন করে দূরে থাকব? সেই প্রত্যাশিত নির্বাচন যখন অনুষ্ঠিত হবে তখন জনগণের সঙ্গে জনগণের মাঝেই থাকব ইনশাআল্লাহ।’
সাক্ষাৎকারে আগামী নির্বাচনে দলের কৌশল, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও তাদের নেতাকর্মীদের বিচার, বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিসহ আরও নানা বিষয়ে কথা বলেন তারেক রহমান।
আগামী নির্বাচনে এককভাবে নাকি জোটবদ্ধভাবে আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে নির্বাচন করবে বিএনপি এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যে দলগুলোকে আমরা রাজপথের আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে পেয়েছি, তারাসহ কমবেশি সকলকে সঙ্গে নিয়ে, সবার মতামত নিয়ে আমরা রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে চাই।’
নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী কিছু দলকে নিয়ে বিএনপি বিরোধী একটি জোট করার ইঙ্গিত দিলেও তাতে কোনও ‘সমস্যা বা উদ্বেগের কারণ’ হিসেবে দেখছেন না বিএনপির এই নেতা। প্রতিযোগিতা করেই বিএনপি সবসময় নির্বাচন করেছে উল্লেখ করে তিনি কথা বলেন মনোনয়নের বিষয়ে।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা এমন ব্যক্তিকেই নমিনেশন দেব, যার ওই এলাকার সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা আছে, মানুষের সম্পৃক্ততা আছে এবং যে সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, তরুণ, নারী, ছাত্র-ছাত্রী সবার সাথে যার একটা যোগাযোগ আছে, জনসমর্থন আছে তাদেরকেই আমরা নমিনেশন দেব।’
নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রধানমন্ত্রীর পদ
আগামী নির্বাচিত সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পদের প্রত্যাশী কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের। এটি তো আমার সিদ্ধান্ত না। এ সিদ্ধান্ত নিবে বাংলাদেশের জনগণ।’ এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকেও সিদ্ধান্ত দলই নেবে বলে জানান তিনি।
আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘না, না, নির্বাচনে অংশ তো নেব, কেন নেব না? অবশ্যই নেব।’
দুর্নীতির প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান
বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ে আলোচনা-সমালোচনার একটি বড় বিষয় ছিল দুর্নীতির অভিযোগ। সেই সময়ে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়েও চলে আলোচনা। এ প্রসঙ্গে আলোচনায় তারেক রহমান তুলে আনেন ২০০১ সালে বিএনপির ক্ষমতার আসার সময়ের কথা।
তিনি বলেন, ‘৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ছিল ক্ষমতায়। ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবরে সরকার নির্বাচনের পর আমরা সম্ভবত ১০ই অক্টোবর সরকার গঠন করি। এর বোধহয় কিছুদিন পরে একটি সূচক বের হলো টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ)। মানে দুই তিন মাস পরেই। নিশ্চয়ই মাত্র নির্বাচিত একটি সরকারের পক্ষে ভালোমন্দ কোন কিছুই তিন মাসে করা সম্ভব না।’
দুর্নীতি এখন ‘সামাজিক ব্যধিতে’ পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাজেই মানুষকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে আস্তে আস্তে করতে হবে। তাতে সময় লাগবে।
আগামীর ভোটারদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সুযোগ পাই, জনগণ যদি আমাদেরকে সেই সুযোগ দেন, তাহলে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে আমরা যেন এমন অবস্থা তৈরি করতে পারি যেখানে কিছুটা হলেও আমরা বহির্বিশ্বে অন্য দেশের সামনে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি।’
দলের কর্মীদের চাঁদাবাজি
৫ আগস্টের পরে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা দখলের মতো নানা অভিযোগ উঠেছে। অনেককে বহিষ্কার করা হলেও তা থামানো যাচ্ছে না কেন? এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারের সময় আমাদের বহু নেতাকর্মী বাড়িতে থাকতে পারতো না। তাদেরকে পালিয়ে থাকতে হতো। এই সুযোগে স্বৈরাচার তাদের ব্যবসা বাণিজ্য দোকান-পাট ঘর বাড়ি জমি জমা পুকুর দখল করে নিয়েছিল। ৫ তারিখে যখন স্বৈরাচার পালিয়েছে, তখন তাদের দখলকারীরাও পালিয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের নেতাকর্মীরা তাদের নিজেদের বৈধ সম্পত্তি, পৈতৃক সম্পত্তি আবার ফিরে পেতে গিয়েছে। আবার সত্যিই দখল করতে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।’
তবে পুলিশিং করতে না পারার ‘ব্যর্থতা সরকারের’ বলেই মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পুলিশ পুলিশের কাজ করবে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের কাজ করবে। বিএনপি ইনশাল্লাহ সরকার গঠন করলে আমার দলের কোন নেতাকর্মী তখনও যদি এরকম কোনও অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ত হয় আমরা দলের অবস্থান থেকে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিব।’
রাজনীতিতে ডাকসুর প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলকে পেছনে ফেলে জয় পায় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। তবে ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে কোনও প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ছাত্র রাজনীতি ছাত্র রাজনীতির জায়গায়, জাতীয় রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির জায়গায়।
আওয়ামী লীগের রাজনীতি
গণআন্দোলনের মুখে পতনের পর নিষিদ্ধ করা হয় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। দল হিসেবে তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারা- না পারার প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, ‘দল হিসেবে তারা যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। দেশের আইন সিদ্ধান্ত নেবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এটি প্রতিশোধের কোন বিষয় নয়। এটি ন্যায়ের কথা। আইনের কথা। অন্যায় হলে তার বিচার হতে হয়। কার সম্পর্কে কী মনোভাব সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
আওয়ামী লীগের কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকা উচিত নাকি, না এমন প্রশ্নের জবাব তিনি ঠেলে দেন জনগণের ওপর। তিনি বলেন, ‘যে দলের ব্যক্তিরা মানুষ হত্যা করে, গুম করে, খুন করে, অর্থসম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে- জনগণ তাদের সমর্থন করতে পারে বলে আমি মনে করি না। জনগণ সমর্থন না করলে কোনও রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক সংগঠনের টিকে থাকার কোনো কারণ আমি দেখি না। যেহেতু জনগণের শক্তিতে আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের সিদ্ধান্তে আমরা বিশ্বাস করি। জনগণের সিদ্ধান্তের উপরে আমরা আস্থা রাখতে চাই। এ বিষয়ে সবচেয়ে বড় বিচারক আমি মনে করি জনগণ।’


