পোড়া সংবাদপত্র, থেমে যাওয়া কলমের প্রতীকী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের ওপর দমন-পীড়ন ও ন্যায়বিচারহীনতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সরস্বতী পূজামণ্ডপে।
মণ্ডপের ওপরে বসানো নামফলকে লেখা প্রতীকী নাম ‘ডেইলি জার্নালিজম গেজেট’, যা সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক পরিচয়কে ধারণ করে। প্রতিমার পেছনে ভাঙা কাচের জানালা ও ক্ষতচিহ্নিত দেয়ালের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের ওপর হামলার প্রতীকী প্রতিবাদ তুলে ধরা হয়েছে।
মণ্ডপের আয়োজকদের একজন রাহী নায়াব বলেন, ‘দেশে বিদ্যমান নৈরাজ্য, অবাধ মব সন্ত্রাস ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বার্তা দিতেই আমাদের এই আয়োজন।’
রাত পোহালে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনায় মাতবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে দেখা যায়, প্রতিমা স্থাপন ও পূজার প্রস্তুতি। প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে জগন্নাথ হলে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। এ বছর হল প্রশাসনের কেন্দ্রীয় পূজাসহ মোট ৭৬টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা সরাসরি এ আয়োজনে অংশ নিয়েছেন।
শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত পুষ্পাঞ্জলি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর প্রসাদ বিতরণ ও অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন রয়েছে। হল মাঠের চারপাশে মণ্ডপ নির্মাণে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন। কেউ হাতে তুলি নিয়ে আঁকছেন নানান ছবি, কেউ কাট বোর্ড দিয়ে সাজাচ্ছেন নিজেদের মণ্ডপ।
হলের পুকুরে চারুকলা ইনস্টিটিউট, উপাসনালয়ে হল প্রশাসন এবং পুকুরপাড়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে পৃথক মণ্ডপের আয়োজন করা হয়েছে।
হল সংসদ নেতাদের দাবি, বিপুলসংখ্যক মণ্ডপ ও দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে এই হলের পূজা বিশ্বের বৃহত্তম সরস্বতী পূজা আয়োজন হিসেবে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
পূজাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে হল প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), শাহবাগ থানা ও ফায়ার সার্ভিস সহযোগিতা করছে।
পলাশী ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে একটি অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ আয়োজন। হল প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন রাইড ও খেলনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাবারের দোকানও বসানো হয়েছে। মাঠের মাঝখানে স্থাপন করা হয়েছে ‘সাউন্ড বক্স’। প্রতিটি বিভাগ নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক থিমে মণ্ডপ সাজাচ্ছে। কেউ রাজকীয় সাজে, কেউ আবার সাদামাটা উপস্থাপনায় তুলে ধরছেন নিজেদের বিভাগের পরিচয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তপু বসাক পুরো মাঠ ঘুরে পুজোর আয়োজন দেখছিলেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিজ পড়াশোনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষার্থীরা যেভাবে মণ্ডপ সাজাচ্ছে, এটা পূজাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে মনে হচ্ছে।
হলের গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব ভবনের সামনে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে প্রতিমা। অভিজ্ঞ শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। গত ১০ বছর ধরে জগন্নাথ হলের পূজার প্রতিমা বানাচ্ছেন দিশু পাল।
তিনি জানান, প্রতিমা সাজাতে ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি খরচ হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই এখানে কাজ করতে ভালো লাগে, তাই নিয়মিত আসি।’
একই সঙ্গে ২৪ তারিখ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হল সংসদের নেতারা। এতে ‘সোনার বাংলা সার্কাস’, ‘গানপোকা’সহ হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলো পরিবেশন করবে বলে জানিয়েছেন হল সংসদের সদস্য লিখন রায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ ইকবাল পরিবার নিয়ে পূজার আয়োজন দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘আয়োজন ভালো হলেও মেলার অভাব অনুভূত হচ্ছে।’ তার মতে, কিছু খাবারের দোকান ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট স্টল থাকলে আয়োজন আরও আকর্ষণীয় হতো।


