দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে ক্রমাগত মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে মুনাফা অর্জনে উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে ক্রমাগত রোগীদের জিম্মি করছে একটি গোষ্ঠী।
নির্দিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালে নিতে রোগীদের স্বজনরা বাধা দিলে এসব মধ্যস্বত্বভোগী প্রায়ই তাদের সঙ্গে শারীরিক হামলায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ হস্তক্ষেপ হয়ে উঠছে প্রাণঘাতী। রোগীকে জোর করে সরিয়ে নিতে গিয়ে জীবনরক্ষাকারী অক্সিজেন মাস্ক জোর করে খুলে ফেলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
এমনই এক ঘটনায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে রোগীকে জিম্মি করে নেওয়ার অভিযোগে হাসপাতালের এক পরিচালকও অভিযুক্ত হয়েছেন।
নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার এ সংকট দীর্ঘদিনের হলেও স্বাস্থ্য প্রশাসন এখনো কার্যকর সমাধান করতে পারেনি।
স্বাস্থ্যখাতের বিশ্লেষকরা বলছেন সমস্যাটি শুধু বাইরের নয়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মচারী এমনকি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধেও যোগসাজশের অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে দালালচক্রের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিলেও তা খুব কমই কার্যকর ব্যবস্থা বা কাঠামোগত সংস্কারে রূপ নেয়। ফলে স্বাস্থ্য খাত ধীরে ধীরে একটি পরজীবী চক্র হিসেবে স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রও এখন এই সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জোরপূর্বক রোগী সরিয়ে নিয়ে মুনাফা করার মাধ্যমে দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেই কার্যত ধ্বংস করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাসপাতাল প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা থাকলেও এখন তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আগে হাসপাতাল তদারকি অনেক বেশি কঠোর ছিল, এখন আর তা নেই।’
সরকারি হাসপাতালে রোগী ধারণ ক্ষমতা ও শয্যাসংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি নেওয়ায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, যা দালালচক্রের অপতৎপরতার সুযোগ বাড়াচ্ছে।’
দালালচক্রের অপতৎপরতাে এমনই এক পাশবিক ও ভয়াবহ ঘটনার ভুক্তভোগী হয়েছে সাত মাস বয়সী শিশু হাসিব আহমেদ মিনহাজ। গত মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা শিশুটিকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে দালালচক্রের এক সদস্য।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি জোরপূর্বক শিশুটির অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলায় সে মারা যায়।
শিশু হাসিবের পরিবার জানায়, রংপুর থেকে শিশুটিকে দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়েছিল। হাসপাতালের কর্মচারী এনায়েত করিম সেখানেই তাদের থামিয়ে দিয়ে দ্রুত শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন।
সন্তানের সু-চিকিৎসা নিশ্চিতের প্রলোভনে তারা সেই দালালের কথায় রাজি হলেও পরে শয্যা সংকটের সুযোগ নিয়ে পরিবারটিকে একটি বেসরকারি ‘হোম কেয়ার হাসপাতালে’ নিতে চাপ দেওয়া হয়।
হাসিবের বাবা হেলাল মিয়া বলেন, ‘চিকিৎসকরা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, দুই মিনিটের জন্যও অক্সিজেন মাস্ক খোলা যাবে না। আমরা দালালকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। তারপরও সে আধা ঘণ্টা হাসপাতাল এলাকায় ঘুরেছে এবং বলেছে আমার ছেলেকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জন্য মাস্ক খুলতে হবে।’
হেলাল মিয়া বলেন, ভবন-২-এর গেট পেরিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার পরই তিনি বুঝতে পারেন তার ছেলে মারা গেছে।
হাসিবের চাচা মো. রিপন বলেন, ‘আমরা গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে তার কথামতোই চলেছি। আমাদের সন্তান বেঁচে থাকলে শান্তি পেতাম। এখন সরকারের কাছে আবেদন, আর কোনো পরিবার যেন এমন শূন্যতার মধ্যে না পড়ে।’

ঢাকার প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই হরহামেশাই একই চিত্র দেখা যায়।
রোগীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ভর্তি, চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দালালদের প্রকাশ্য সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মাঝে মাঝে অভিযান, গ্রেপ্তার ও সতর্কতা জারি হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার একই চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
রোগীদের দাবি, অস্ত্রোপচার ও জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক সময় হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিকেই তাদের জোর করে পাঠানো হয়।
সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি বিকল বা পরীক্ষায় বেশি সময় লাগায় সেই সুযোগে একটি মহল রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিশু হাসিবের মৃত্যুর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক কর্মচারী পরিচয় গোপন রেখে টাইমসকে বলেন, ‘হাসপাতালের ভেতরে কিছু কর্মচারীর জড়িত থাকা বা নীরব সমর্থন ছাড়া দালালদের এভাবে কাজ করা সম্ভব নয়।’
এ ধরনের ঘটনায় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
এ সংকট এখন হাসপাতাল নেতৃত্বকেও সরাসরি চাপে ফেলেছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী এক দালাল-সংশ্লিষ্ট রোগী মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
ওই ঘটনায় এক রোগীকে প্রলোভন দেখিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়, তবে তিনি সেখানেও যথাযথ চিকিৎসা পাননি। পরে গুরুতর অবস্থায় রোগীকে সরকারি হাসপাতালে ফিরিয়ে আনার পর তার মৃত্যু হয়।
এমন পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে গেলে রোগীর শোকাহত স্বজনদের ওপর দালালরা সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায় বলেও অভিযোগ ওঠে।
নিহত ওই ব্যক্তির নাম জিন্নাত আলী। তার ছেলে আবু হুরায়রা ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এর পর শেরেবাংলা নগর থানাকে ১৬ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবু হুরায়রা বলেন, গত রমজানে তার বাবাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে শহীদ নামের এক ওয়ার্ডবয় ও তার সহযোগীরা উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দিয়ে জিন্নাত আলীকে ‘হৃদয় জেনারেল হাসপাতালে’ নিতে পরিবারকে রাজি করায়।
কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার পর পরিস্থিতি চিকিৎসার বদলে চাঁদাবাজিতে রূপ নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আবু হুরায়রার দাবি, চিকিৎসা না দিয়ে তার বাবাকে জিম্মি করে টাকা দাবি করা হচ্ছিল। তিনি নিজেও ওই দালাল চক্রের কাছে আটকে পড়েন ও মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
জানান, ধার করে টাকা দেওয়ার পর তিনি ছাড়া পান।
জিন্নাত আলীকে সরকারি হাসপাতালে ফেরত আনার সময় অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে পরিবারটি বিচার চাইতে গেলে তাদের ওপর আবারও হামলা ও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকির মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন আবু হুরায়রা।
রাজধানী ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রমাগত বাড়ছে দালালচক্রের তৎপরতা। সেখানে দালালরা হাসপাতালের কর্মচারী পরিচয়ে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে স্বল্প শিক্ষিত কিংবা গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত রোগী ও স্বজনদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তাদের উন্নত চিকিৎসক ও দ্রুত পরীক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে মুনাফা লাভের চেষ্টা করে একটি গোষ্ঠী।
হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
তবে দালালচক্রকে প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। শংকর বিশ্বাস রোগীদের অপরিচিত লোকের কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে কেবল সরকারি তথ্যকেন্দ্র বা দায়িত্বে থাকা চিকিৎসাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানান।
বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দীর্ঘদিন ধরে একটি সংগঠিত দালালচক্র রোগী ও স্বজনদের হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালের প্রধান ফটক ও ভেতরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে তারা রোগীদের আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে গত ১১ মে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এলাকায় দালালদের সহিংসতা বন্ধে কঠোর নির্দেশ দেন।
পরদিন জেলা প্রশাসনের অভিযানে দালালচক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় কয়েকজন আটক ব্যক্তি স্বীকার করেন, তারা কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করতেন।
প্রতিটি রোগী বেসরকারি পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠিয়ে তারা ৫০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত পেতেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম টিটন টাইমসকে বলেন, ‘দালাল সমস্যা বহু বছর ধরে হাসপাতাল ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্দেশনা দেওয়া হলেও সরকারি হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের লড়াই এখনো চলছে।’
হাসপাতাল থেকে দালালচক্র নির্মূলে শিগগিরই নতুন নির্দেশিকা জারি করা হবে বলেও জানান টিটন।


