‘সাঁতাও’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩ এ চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছে— শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র, শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক। গণঅর্থায়নে নির্মিত ছবিটির পরিচালক খন্দকার সুমনের ছবিটি নির্মাণে সহায়তা করেছে ১৫৫৯ জন মানুষ।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অল্প অল্প করে চাঁদা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কাজ করার ব্যাপারটি থেকে সুমনের মাথায় আসে তিনি এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন, যেটার জার্নির সঙ্গে শতাধিক মানুষ যুক্ত থাকবে। এদেরকে তো চাইলে শুটিং টিমে নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারা ফান্ড দেওয়ার মাধ্যমে ছবিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।
অনেকে মনে করেন তিনি বুঝি গণঅর্থায়নে পুরো ছবিটি শেষ করেছিলেন। কিন্তু ব্যাপারটি এত সহজ ছিল না। ফান্ড থেকে ছবির ব্যয়ের একটা অংশ উঠেছিল। বাকি টাকা তুলতে ধার-দেনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়িও বিক্রি করতে হয়েছিল তাকে। ‘সাঁতাও’-এর লোগো সম্বলিত টি-শার্ট বিক্রি করে ছবির মুক্তির অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন।
প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আইনুন পুতুল ও ফজলুল হক। কোন তারকাশিল্পীকে না নেওয়ার ব্যাপারে সুমন বলেন, ‘আমি যদি তারকা নিতাম, তাহলে চলচ্চিত্র থেকে দর্শকদের বেশি চিন্তা থাকতো সে কী করছে তা নিয়ে। তারা তখন গল্প দেখতে যেতো না। পরবর্তীতে বলতো এই তারকা এই গল্পের সঙ্গে মেলেনি।’
সুমন চেয়েছিলেন এমন একজনকে যিনি ভালো অভিনয় জানেন এবং দেখলে পাশের বাড়ির মানুষ মনে হয়। ফজলুল হককে দেখে তার মনে হয়েছিল জমিতে চাষাবাদ করে এমন চেহারার। অন্যদিকে পুতুলের চেহারায় ‘মাতৃত্ব’ ও ‘মায়াবতী’ ব্যাপারটা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
এ ছবির জন্য ‘সেরা শব্দগ্রাহক’র পুরস্কার পেয়েছেন সুজন মাহমুদ। সাধারণত ছবিতে ডাবিং করা হলেও সুমন তার ছবিতে ‘লোকশন সাউন্ড’ ব্যবহার করেছেন। অনেকে মনে করেন বাজেটের অভাবে এমনটি করা হয়েছে। তবে সুমন জানালেন, দর্শকদের সত্যিকার পরিবেশের অনুভূতি দেওয়ার জন্য এটি করা হয়েছে। এতে বরং ডাবিংয়ের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘লোকেশন সাউন্ড ব্যবহার করতে হলে এর জন্য আলাদা করে যন্ত্রপাতির ভাড়া, সাথে থাকে টেকনিশিয়ানদের পারিশ্রমিক দিতে হয়। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যেত কোনো দৃশ্যের সবই ঠিক আছে শব্দ ছাড়া, সে দৃশ্য আবার নিতে হত। এতে করে খরচ বেড়েছে।’
সুমন ‘সাঁতাও’-এর আগে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পৌনঃপুনিক’ (Pounopunik) ও ‘অঙ্গজ’ (Ongoj) নির্মাণ করেন। শুধু তিনি না তার টিমের প্রায় সবাই নতুন ছিলেন। ছবিটি বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি বা মুক্তির সময়ে সমস্যা ছাড়া এ নিয়ে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি তাকে। বরং তার মতে, নতুনদের মধ্যে কাজের ব্যাপারে ‘কমিটমেন্ট’ বেশি থাকে। অভিনয়শিল্পীদের কাজ থেকে কাজ বের করে আনা সহজ হয়।
একটি নৌকাবাইচের দৃশ্য দিয়ে ছবির শুরু। এ দৃশ্যে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। এ ব্যাপারে সুমন জানান, গাইবান্ধায় দৃশ্যটি সত্যিকারের একটি নৌকাবাইচের। এর আয়োজকদের একজন আলমগীর কবীর বাদলের সহায়তায় দর্শকদের শুটিংয়ের কথা না জানিয়ে দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন।
ফ্রান্স, ভারতসহ বিশ্বের অনেক অন্যান্য দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের সরকার নানান সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। সুমনের মতে, আমাদের দেশে এটি শুধু ‘একটি ইভেন্ট’র মত হয়ে গেছে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ীদের খুব একটা খবর কেউ নেয় না। কিন্তু সরকার চাইলে পরবর্তীতে তাদেরকে নানাভাবে সহায়তা করতে পারে।
চলচ্চিত্রে সরকার প্রতি বছর অনুদান দিচ্ছে। সুমনের চাওয়া অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে তার চিত্রনাট্যটি যেন সরকার বিবেচনায় নেয়। কারণ তিনি পরবর্তী সিনেমাটি সরকারি অনুদানে নির্মাণ করতে চান।


