একসময় মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল ইছামতী নদী এখন যেন স্থবির জলাশয়। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। কোথাও নদী শুকিয়ে গেছে, কোথাও জমে আছে আবর্জনা আর কচুরিপানা। অবারিত প্রবহমান কল্লোলিত ইছামতি এখন মৃতপ্রায়।
জানা গেছে, দৌলতপুর থেকে ঘিওর, শিবালয় হয়ে হরিরামপুর পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ইছামতী নদী বাহাদুরপুরে পদ্মায় মিশেছে। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে এই নদীর মূল প্রবাহই হারিয়ে গেছে। আর এখন শাখা নদীটিও বিলীন হয়ে যাচ্ছে দখলদারদের আগ্রাসনে।
নদীর বিভিন্ন স্থানে নির্মিত ১০ থেকে ১২টি বাঁধের অনেকগুলোই অকেজো। এসব অপ্রয়োজনীয় বাঁধের ওপর দোকানপাট ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। এই বাঁধগুলোর কারণে নদীর পানিপ্রবাহ ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। তাতে নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক গতি।
আন্ধারমানিক গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘২৫ বছর আগে পদ্মায় ভিটেমাটি হারিয়ে এখানে এসেছিলাম। তখন নদীর বুকে প্রাণ ছিল, এখন শুধুই কচুরিপানা আর দুর্গন্ধ।’

একই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, বাঁধের কারণে পানি চলাচল বন্ধ, ফলে ফসল ফলানোও কঠিন হয়ে গেছে।
নদীপথে পদ্মার জল না পৌঁছানোয় হরিরামপুরের ভাতছালা, দিয়ার ও গোপীনাথপুর বিলও শুকিয়ে গেছে। একসময় এসব বিলে ফসল ও মাছের প্রাচুর্য ছিল। ঠিকমতো ফসল ফলাতে না পেরে এবং মাছের অভাবে এখন কৃষক-জেলে পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছে দারিদ্র্য আর হতাশায়।
পরিবেশ সংগঠন শ্যামল নিসর্গের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম মাহী বলেন, ‘অপরিকল্পিত বাঁধ ও দখলদারদের কারণে ইছামতী মৃতপ্রায়। কৃষি, মৎস্য, এমনকি মানুষের জীবনও বিপর্যস্ত হচ্ছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই মানচিত্র থেকে মুছে যাবে নদীটি।’
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘ইছামতী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে দুটি বাঁধ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সেগুলো অপসারণ করে হাইড্রোলিক স্ট্রাকচার স্থাপন করা হবে।’
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. মানোয়ার হোসেন মোল্লা জানান, ‘ফসল রক্ষায় স্থানীয়রা নিজেরাই বাঁধ দিয়েছিলেন, যা এখন সমস্যা তৈরি করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং পাউবোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাঁধগুলো অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য। আশা করছি দ্রুতই ইছামতী আবার প্রাণ ফিরে পাবে।’
নদী রক্ষায় অবিলম্বে দখল উচ্ছেদ, বাঁধ অপসারণ ও খনন কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া গেলে ইছামতী আবারও আগের রূপে ফিরবে এবং জেলে-কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে বলেই তাদের আশা।


