বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’। এতে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ এশীয় এই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
“তারেক রহমানের সাথে একটি সাক্ষাৎকার – সম্ভবত বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী” শীর্ষক প্রতিবেদনে নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকটি জনমত জরিপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। নোবেল জয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের আগে ব্লুমবার্গ, টাইম এবং দ্য ইকোনমিস্টের মতো বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে এগিয়ে থাকার কথা বলার পর দ্য ডিপ্লোম্যাট তাকে ‘ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বরে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন দেখা গেছে। যেখানে এর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ছিল ১৯ শতাংশ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের পরিচালিত অন্য একটি জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ এখন তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন, যেখানে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আশা করছেন।
দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর পর্যবেক্ষণ অনুসারে জেনারেশন জেড বা জেন-জি নামে পরিচিত তরুণরা এই নির্বাচনে একটি প্রধান নির্ধারক শক্তি হতে চলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, “এই নির্বাচনে ভোটারদের একটি বড় অংশ জেন-জি থেকে আসা, যার অর্থ বাংলাদেশের তরুণরাই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করবে।” এতে আরও বলা হয়, “অনেক জেন-জি ভোটার বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে অংশ নিচ্ছেন, বিশেষ করে যেগুলোর নেতৃত্বে রয়েছেন দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান।”
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সিরাজগঞ্জে একটি নির্বাচনী জনসভা শেষে বাসে করে টাঙ্গাইলে আরেকটি জনসভায় যাওয়ার পথে সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। সে সময় তিনি অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির পরিকল্পনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্নের উত্তর দেন। জেন-জি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, তারা জেন-জি’র চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি সেক্টর এবং চাকরির বাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, যা আমার বিশ্বাস জেন-জি-র কাছে জোরালোভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে। আপনি যদি আজকের পরিবেশের দিকে তাকান, তবে লক্ষ্য করবেন যে সভায় উপস্থিতদের বেশিরভাগই ছিলেন জেন-জি।”
তারেক রহমান এই সংবাদমাধ্যমকে আরও জানান, তিনি “দ্য প্ল্যান” নামের একটি কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের কথা শোনেন, যেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের শিক্ষার্থীরা তাদের চিন্তা, উদ্বেগ এবং ধারণাগুলো শেয়ার করে। তিনি বলেন, “আমি সত্যিই তাদের সাথে যুক্ত হতে উপভোগ করি।”
দ্য ডিপ্লোম্যাট উল্লেখ করে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ভারতকেন্দ্রিক একটি পররাষ্ট্রনীতি ছিল বলে সমালোচনা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত বাংলাদেশের ওপর নজর রাখছিল। সংবাদমাধ্যমটি তারেক রহমানের কাছে জানতে চায় তার পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে। জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের জাতীয় স্বার্থ অবশ্যই আগে আসতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি। আমরা একটি অর্থনীতি-ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিকে অগ্রাধিকার দেব যা বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। আমরা আমাদের বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক লাভে বিশ্বাস করি। আমরা যে দেশগুলোর সাথেই যুক্ত হই না কেন, আমাদের জাতীয় স্বার্থ অবশ্যই সবার আগে থাকতে হবে।”
জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করবে। তিনি বলেন, “আমরা আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা সমুন্নত রাখব এবং সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করব।”
ভোট প্রসঙ্গে দ্য ডিপ্লোম্যাট তারেক রহমানকে মনে করিয়ে দেয়, জেন-জি-র একটি অংশ, বিশেষ করে যারা এনসিপির প্রতি অনুরাগী, তারা তার বিরোধিতা করবে এবং আগামী দিনে সংসদে ও রাজপথে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। প্রতিকূল জেন-জি সম্পর্কে তিনি কতটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করেন জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, “আমি চ্যালেঞ্জ অনুভব করি না। আমরা একটি রাজনৈতিক দল। আমরা আমাদের পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি এবং অন্যরা একই কাজ করছে। জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কোন পরিকল্পনাটি তাদের জন্য ভালো।”
তিনি আরও যোগ করেন, বিএনপি জেন-জি’র চিন্তাধারার সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, “আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, খেলাধুলা, আইটি সেক্টর এবং চাকরির বাজারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, যা আমি বিশ্বাস করি জেন-জি’র কাছে প্রবলভাবে সাড়া ফেলছে।”
তারেক রহমান বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা একটি “দিবাস্বপ্ন” কি না জানতে চাওয়া হয়েছিল। কারণ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সস্তা শ্রম এবং তৈরি পোশাক খাত নিয়ে বাংলাদেশ কি বাস্তবসম্মতভাবে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জন করতে পারে? জবাবে তিনি বলেন, “এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, ২০ কোটি মানুষের মধ্যে পাঁচ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান প্রয়োজন। তারেক রহমান যোগ করেন, “আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে হবে। আমাদের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করতে হবে এবং সারা দেশে ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করতে হবে।”
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—তৈরি পোশাক এবং রেমিট্যান্স—যা তার মতে বিএনপি সরকারের আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমরা এখন আইটি সেক্টরে জোর দেব। একই সঙ্গে আমরা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, হালকা প্রকৌশল, জুতা এবং এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও নজর দেব।”
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসহ খাদ্য খাতে শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা যথেষ্ট মাছ ও শাকসবজি উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি। আমরা সৃজনশীল অর্থনীতিতেও সুযোগগুলো খতিয়ে দেখছি।”
ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবিলা করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যদি আমরা শক্তিশালী আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করি, তবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। আমাদের প্রতিশ্রুতি হলো একটি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, তার দল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যেতে চায় যেখানে মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না। যেখানে “মানুষ রাতে ভয়হীনভাবে ঘরে ফিরতে পারবে এবং অর্থনীতি সঠিকভাবে চলবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, “আমরা শুরু করব, কারণ আমাদের শুরু করতেই হবে। আমরা দায়িত্বশীলভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করব এবং বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করব।”
তিনি বলেন, বিএনপি ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেবে। “বাস্তবতা খুবই কঠিন। অতীতে ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়ার জন্য মাত্র ২০ ফুট খননই যথেষ্ট ছিল, কিন্তু আজ ৩০০ ফুট খনন করেও অনেক সময় পানি পাওয়া যায় না। সুতরাং, খাল খনন ‘উচ্চাভিলাষী’ নয়, এটি অনিবার্য।”
তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তারেক রহমান বলেন, “আমরা আমাদের ৩১ দফা সনদ বাস্তবায়নে কাজ করব। বিশেষ করে, আমরা ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড বা কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষার মতো সাতটি মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছি এবং আমরা এই বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেব।”
সব শেষে তিনি বলেন, “জনগণের স্বার্থ ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের মাধ্যমে আমরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনব। আমরা জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রাখব। আমরা জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করব—এটিই দেশবাসীর কাছে আমার অঙ্গীকার।”


